বিদ্যুৎ ঘাটতি, ঝুঁকিতে উত্তরাঞ্চলের বোরোচাষ
রাজশাহী অঞ্চল দিয়ে বয়ে যাচ্ছে তাপপ্রবাহ। এর মধ্যে জ্বালানি সংকট ও ঘনঘন বিদ্যুতের আসা যাওয়া চলছে। এতে বোরোর সেচ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃষকরা তাদের বোরো ধান নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদনও কমে গেছে। জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদামতো বিদ্যুৎ না পাওয়ায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। শিগগিরই এর উন্নতির সম্ভাবনা নেই বলেও জানান বিদ্যুৎ বিভাগ সংশ্লিষ্টরা। এদিকে আগামী ২১ এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে এসএসসি পরীক্ষা। এই সময়ে বিদ্যুতের ঘাটতির ফলে শিক্ষার্থীদের জন্য মরার উপর খাঁড়ার ঘা’র মতো।
এদিকে লোডশেডিংয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ব্যবসায়ীরাও। তারা বলছেন, সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দোকানপাট। এরমধ্যে দিনভর ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠছে। বিশেষ করে ব্যবসায়ীরা পড়েছেন বিপাকে। ব্যবসা বাণিজ্যে মন্দার কারণে লোকসানের মুখে পড়ছেন তারা।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, রাজশাহীতে মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ চলছে। শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৪ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগের দিন বুধবার (১৫ এপ্রিল) ৩৯ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়।
এই তাপমাত্রায় বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে। গ্রামাঞ্চলে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। সেচনির্ভর বোরো চাষ কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষকরা জানান, ফসলের বৃদ্ধির এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অনিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহের কারণে সেচের সময়সূচি ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। সেচ না দিলে ফসলেরও বেশ ক্ষতি হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিপ্ততরের তথ্যমতে, চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজশাহীতে ৬৮ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হচ্ছে।
রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, ধান এখন বাড়ন্ত অবস্থায় আছে। দুই থেকে তিন সপ্তাহ পর পাকতে শুরু করবে। সময়মতো সেচ না দিলে ফলন কমে যাবে। কয়েকদিন থেকে বিদ্যুৎ বিভ্রাট বেড়েছে। এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া গেলে দুই ঘণ্টা থাকছে না। বিদ্যুৎ থাকছে না আমরা ডিজেল পাম্পের ওপর নির্ভর করছি। কিন্তু জ্বালানি ব্যয়বহুল ও পাওয়াও যাচ্ছে না।
গোদাগাড়ী উপজেলার বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের গভীর নলকূপ অপারেটর আবদুর রহমান বলেন, কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সেচ ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাপপ্রবাহের কারণে ঘন ঘন সেচের প্রয়োজন বাড়ছে। লোডশেডিং এভাবে চলতে থাকলে বোরো ধানের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
গোদাগাড়ীর দিয়ারমানিক চরের কৃষক আব্দুল্লাহ বিন সাফি বলেন, গতবছরের তুলনায় সেচের জন্য ইতোমধ্যেই অনেক বেশি খরচ করে ফেলেছি। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে, উৎপাদন ভালো হলেও আমাদের লোকসান হতে পারে।
গেল কয়েকদিন থেকে লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় গরমে মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। লোডশেডিংয়ের মাত্রা চরম পর্যায়ে পৌঁছায় ঘরে বাইরে কোথাও একটু স্বস্তি মিলছে না। দিনের বেলায় ১ ঘন্টা পর পর থাকছে না বিদ্যুৎ। এমনকি রাতেও একাধিকবার লোডশেডিং হচ্ছে। গরমের তীব্রতা ও লোডশেডিংয়ে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে বয়স্ক, শিশু ও অসুস্থরা পড়েছেন বিপাকে। তীব্র গরমে অতিরিক্ত ঘেমে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন অনেকেই। অফিস-আদালতে কাজে নেমে এসেছে স্থবিরতা। ব্যবসা-বাণিজ্যে দেখা দিয়েছে মন্দাভাব।
বাগমারা বিএস স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক জেসমিন আক্তার বলেন, আর তিনদিন পর ২১ এপ্রিল থেকে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। এখন যেভাবে বিদ্যুৎ যন্ত্রণা আছে। একঘণ্টা পাওয়া গেলে দুই ঘণ্টা অন্ধকারে থাকতে হচ্ছে। এভাবে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সমস্যা হচ্ছে।
রাজশাহী নগরীর সাহেববাজারের রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকান বন্ধ করতে হচ্ছে। সকাল খুলতে খুলতে ১১টা বেজে যায়। ক্রেতারা আসেন দুপুর থেকে। এরমধ্যে সারাদিনের অর্ধেক সময়ও বিদ্যুৎ থাকেনা। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসাবাণিজ্য বন্ধ করা ছাড়া কোন উপায় নেই।
বগুড়া ২৩০/১৩২ কেভি গ্রিড এস/এস-এর উপ-সহকারী প্রকৌশলী ইকবাল হোসেন বলেন, এখান থেকে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়ে থাকে। এই দুই বিভাগে চাহিদার এক-তৃতীয়াংশের কম পাওয়া যাচ্ছে। যদিও বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে উৎপাদন বাড়াতে বলা হয়েছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইনের কারণে তেল ট্যাঙ্কারে করে বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহে বিলম্ব পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-পরিচালক সাবিনা বেগম বলেন, এই পর্যায়ে পানি সরবরাহের অভাবে ফসলের আংশিক বা এমনকি উল্লেখযোগ্য ক্ষতিও হতে পারে। জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে, বিশেষ করে ডিজেল চালিত সেচ পাম্পের ওপর নির্ভরশীল কৃষকদের জন্য। অনেকেই জানিয়েছেন, আগের মৌসুমগুলোর তুলনায় এ মৌসুমে সেচের খরচ বেশি হয়েছে।
নেসকোর প্রধান প্রকৌশলী জিয়াউল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন সময় বিদ্যুতের চাহিদা ভিন্ন। শুক্রবার রাজশাহীতে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৫৫০ মেগাওয়াট কিন্তু পাওয়া এর চেয়ে কিছুটা কম। বৃহস্পতিবারও সারাদিনের চাহিদা ছিল ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। কিন্তু পাওয়া গেছে ৪৬০ মেগাওয়াটের মতো। গরম যত বেশি হয় চাহিদা বাড়ে বিদ্যুতের। তখন লোডশেডিং হচ্ছে।