চাঁপাইনবাবগঞ্জে শুরু হলো ড্রাই আনারসের বাণিজ্যিক উৎপাদন
আমের জন্য সুপরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জে এবার যুক্ত হয়েছে কৃষিভিত্তিক শিল্পের নতুন দিগন্ত, বাণিজ্যিকভাবে ড্রাই (শুকনো) আনারস উৎপাদন। স্থানীয় পর্যায়ে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে উদ্যোক্তা, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য, পুষ্টিগুণ বজায় রাখা এবং বাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদা, সব মিলিয়ে ড্রাই আনারসকে ঘিরে তৈরি হয়েছে সম্ভাবনার নতুন অর্থনীতি।
সরেজমিনে শিবগঞ্জ পৌরসভার পাইলিংক মোড় এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, উদ্যোক্তা ইসমাইল খান শামীমের কারখানায় আধুনিক পদ্ধতিতে আনারস প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। স্থানীয় শ্রমিকদের অংশগ্রহণে গড়ে উঠেছে একটি ক্ষুদ্র শিল্পভিত্তিক কর্মপরিবেশ, যেখানে মৌসুমি কাজের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে সারা বছর আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। শ্রমিক আকালু ইসলাম জানান, আগে অনিয়মিত কাজ ছিল, এখন ড্রাই আনারস কারখানায় নিয়মিত কাজের সুযোগ পাচ্ছি।
উদ্যোক্তা ইসমাইল খান শামীম মূলত আম প্রক্রিয়াজাতকরণ দিয়ে তার যাত্রা শুরু করেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমের দাম কমে যাওয়া, সংরক্ষণ সংকট এবং অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে তিনি বিকল্প খুঁজতে বাধ্য হন। প্রথমে ড্রাই ম্যাংগো উৎপাদনে সাফল্য পাওয়ার পর তিনি আনারসকে নতুন সম্ভাবনা হিসেবে বেছে নেন।
তিনি বলেন, আনারস নিয়ে কাজ শুরুটা সহজ ছিল না। কয়েক দফা পরীক্ষার পর আমরা এমন একটি পদ্ধতি দাঁড় করাতে পেরেছি, যাতে স্বাদ, রং ও মান ঠিক থাকে। বর্তমানে তার উৎপাদিত ড্রাই আনারস স্থানীয় বাজারে ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছে।
কারখানায় আনারস প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রতিটি ধাপই নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়। প্রথমে পাকা আনারস বাছাই, ধোয়া ও পরিষ্কার করা হয়। এরপর খোসা ছাড়িয়ে সমান আকারে কাটা হয়। পরে বিশেষ ড্রায়ার মেশিনে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় দীর্ঘ সময় ধরে শুকানো হয়। এতে আনারসের প্রাকৃতিক স্বাদ ও পুষ্টিগুণ অনেকাংশে বজায় থাকে, পাশাপাশি এটি দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য হয়ে ওঠে।
এই উদ্যোগ শুধু একটি পণ্য উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলছে। কৃষকদের জন্য তৈরি হচ্ছে নতুন ফসল চাষের সুযোগ, শ্রমিকদের জন্য বাড়ছে কর্মসংস্থান, আর উদ্যোক্তাদের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে নতুন বাজার।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক শারজানা আক্তার সাবা বলেন, ফল প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে মৌসুমভিত্তিক অপচয় কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পেলে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এই উদ্যোগকে টেকসই করতে উদ্যোক্তাদের প্রযুক্তিগত সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে আনারস চাষ শুরু হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে প্রক্রিয়াজাত শিল্পের জন্য কাঁচামালের স্থায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।
উপ-পরিচালক ড. ইয়াছিন আলী বলেন, ড্রাই আনারস উৎপাদনকে আমরা সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবে দেখছি। পরিকল্পিতভাবে এগোতে পারলে এটি জেলার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ড্রাই আনারস ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাজার তৈরি করতে শুরু করেছে। উদ্যোক্তারা মনে করছেন, মানসম্মত উৎপাদন ও আধুনিক প্যাকেজিং নিশ্চিত করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারেও এর চাহিদা তৈরি হবে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের স্বাস্থ্যসচেতন ভোক্তাদের কাছে এ ধরনের প্রক্রিয়াজাত ফলের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। কাঁচামালের ধারাবাহিক সরবরাহ, মান নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং রপ্তানি প্রক্রিয়ার জটিলতা এখনো বড় বাধা। এছাড়া উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও বাজারসংযোগ বাড়ানো না গেলে এই শিল্পের বিস্তার ব্যাহত হতে পারে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি এখন আমের একমুখী নির্ভরতা থেকে ধীরে ধীরে বহুমুখীকরণের পথে হাঁটছে। ড্রাই আনারস সেই পরিবর্তনের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তি ও বাজার সংযোগ নিশ্চিত করা গেলে এই উদ্যোগ শুধু একটি পণ্য নয়, বরং জেলার অর্থনীতিতে নতুন বিপ্লবের সূচনা করতে পারে।