বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ৩০, ২০২৬

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ঘন ঘন লোডশেডিং, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ১১:১০ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ১১:১০ অপরাহ্ন
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ঘন ঘন লোডশেডিং, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম

মৃদু তাপপ্রবাহের মধ্যেই চাঁপাইনবাবগঞ্জে ঘন ঘন লোডশেডিং জনজীবনকে প্রায় অচল করে তুলেছে। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মাত্রা আরও তীব্র, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষি, ব্যবসা ও দৈনন্দিন জীবনে। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে সেচ নির্ভর কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় দেখা দিয়েছে উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা।


সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দিন-রাত মিলিয়ে একাধিকবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা ঘটছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা। নাচোল উপজেলার নেজামপুর ইউনিয়নের কৃষক মাসুদ রানা বলেন, এই সময় জমিতে নিয়মিত পানি দিতে হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ বারবার চলে যাওয়ায় পাম্প চালানো যাচ্ছে না। ধান নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। একই চিত্র শিবগঞ্জ ও সদর উপজেলার চরাঞ্চলেও, যেখানে বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহে সেচ কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।


শহরাঞ্চলেও পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক নয়। পৌরসভার আরামবাগ এলাকার বাসিন্দা শান্ত জানান, সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কয়েকবার বিদ্যুৎ যায়। ফ্রিজের খাবার নষ্ট হওয়ার ভয় আছে। ক্লাব সুপার মার্কেটের কাপড় ব্যবসায়ী রাজিম বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় দোকান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। গরমে ক্রেতারা আসলেও বেশিক্ষণ থাকেন না, বিক্রি কমে গেছে।


বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হঠাৎ করেই বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেছে, যা সরবরাহের তুলনায় অনেক বেশি। নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো)-এর চাঁপাইনবাবগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আলিউল আজিম জানান, জেলায় চাহিদা ৩১-৩২ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২৫-২৬ মেগাওয়াট। ফলে ৫-৬ মেগাওয়াট ঘাটতির কারণে বাধ্য হয়ে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।


অন্যদিকে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন। জেনারেল ম্যানেজার হাওলাদার মো. ফজলুর রহমান বলেন, বর্তমানে চাহিদার তুলনায় ৩০-৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ কম পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে বোরো চাষের জন্য গ্রামাঞ্চলে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় লোডশেডিং বাড়ছে।


বিশ্লেষকরা বলছেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিদ্যুৎ সংকট একটি বহুমাত্রিক সমস্যার প্রতিফলন। একদিকে তাপপ্রবাহজনিত বাড়তি চাহিদা, অন্যদিকে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, এই দুইয়ের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে বর্তমান পরিস্থিতি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সেচনির্ভর কৃষির ওপর বাড়তি চাপ, যা সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে।


কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, বোরো মৌসুমে সেচে সামান্য ব্যাঘাতও ফলনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। সময়মতো পানি না পেলে ধানের চারা শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা সরাসরি খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।


সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কৃষিখাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ বণ্টন নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি বিকল্প শক্তির উৎস, যেমন সৌরবিদ্যুৎ নির্ভর সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।


চাঁপাইনবাবগঞ্জে লোডশেডিং এখন শুধু সাময়িক ভোগান্তি নয়, এটি কৃষি, অর্থনীতি ও জনজীবনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে জেলার সামগ্রিক উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।