বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ৩০, ২০২৬

সেই নারী শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত!

নিজস্ব প্রতিবেদক ও দুর্গাপুর প্রতিনিধি ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩৭ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ও দুর্গাপুর প্রতিনিধি ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩৭ অপরাহ্ন
সেই নারী শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত!

দুর্গাপুর উপজেলার দাওকান্দি সরকারি কলেজের নারী শিক্ষক (প্রদর্শক) আলেয়া খাতুন ওরফে হীরাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। অধ্যক্ষের কার্যালয়ে বিএনপিকর্মী শাহাদ আলীকে চড় মারার ঘটনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে আলেয়াকে স্যান্ডেলপেটা করা ওই বিএনপিকর্মী শাহাদ আলী এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। তার বিরুদ্ধে আগেই গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলেও পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে পারেনি। একইসঙ্গে কলেজ কর্তৃপক্ষও ভয়ের কারণে কোনো মামলা করেনি।


বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) তাফসির মাহফিলের জন্য চাঁদা সংগ্রহ করতে কয়েকজন বিএনপি নেতা কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ইউনিয়ন বিএনপির সহ সভাপতি আকবর আলী, ইউনিয়ন কৃষক দলের সভাপতি জয়নাল আবেদীন, ওয়ার্ড বিএনপির নেতা আফাজ উদ্দিন, এজদার আলী এবং গ্রাম্য মাতব্বর আব্দুস সামাদ ওরফে সামাদ দারোগা।


অধ্যক্ষের কার্যালয়ে উপস্থিত অবস্থায় তাদের সঙ্গে শিক্ষক আলেয়া খাতুন হীরার বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। আলেয়ার অভিযোগ, এ সময় শাহাদ আলী তাকে উদ্দেশ্য করে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি শাহাদ আলীকে একটি চড় দেন। এর জেরে শাহাদ আলী তাকে স্যান্ডেলপেটা করেন এবং চুল ধরে টানাহেঁচড়া করেন। একই সময় অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাককেও মারধর করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।


ঘটনার পর বিএনপি নেতাকর্মীরা শনিবার (২৫ এপ্রিল) সংবাদ সম্মেলন করে অধ্যক্ষ ও শিক্ষকের অপসারণের দাবিতে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেয়। পাশাপাশি বিকেলে এলাকায় বিক্ষোভ কর্মসূচিও পালন করা হয়।


পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি) রাজশাহী অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক মো. আছাদুজ্জামান রোববার (২৬ এপ্রিল) দুপুরে কলেজটি পরিদর্শন করেন এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তবে তিনি কলেজে গিয়ে অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক ও শিক্ষক আলেয়া খাতুনকে পাননি। অসুস্থতার কারণে তারা অনুপস্থিত রয়েছেন বলে জানানো হয়।


পরে কলেজ থেকে ফিরে মাউশি কার্যালয়ে অধ্যক্ষকে ডেকে আলেয়া খাতুন হীরাকে সাময়িক বরখাস্ত করার নির্দেশ দেন পরিচালক অধ্যাপক মো. আছাদুজ্জামান। বিষয়টি তিনি নিজেই নিশ্চিত করে বলেন, উচ্ছৃঙ্খল আচরণের অভিযোগে আলেয়ার বিরুদ্ধে এলাকায় বিক্ষোভ হচ্ছে। এ কারণে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ঘটনার বিষয়ে অধ্যক্ষ ও শিক্ষককে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে এবং তাদের জন্য ২৪ ঘণ্টার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।


রাজশাহী অঞ্চলিক মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অফিধদপ্তরের পরিচালক প্রফেসর মোহা. আছাদুজ্জামান আরও বলেন, ‘তদন্তের স্বার্থে তাকে সমায়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। তিনি সরকারি শিক্ষক না। তিনি আমাদের (মাউশি) অধিনে চাকরি করেন, তিনি এমপিওভুক্ত শিক্ষক। এটা সমাধান না হওয়া পযন্ত তিনি সাময়িক বরখাস্ত থাকবেন।’


এ ছাড়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকেও ঘটনার বিষয়ে একটি প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট তিনটি প্রতিবেদন একত্র করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে বলে জানা গেছে।


মাউশি কার্যালয়ে কথা হলে অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক অভিযোগ করে বলেন, একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে কলেজের পুকুর ইজারা নিয়ে মাছ চাষ করলেও কোনো টাকা দেয় না। তারা কলেজের জমিতে পুকুর খনন করেও অর্থ পরিশোধ করেনি। বরং দফায় দফায় এসে নানা অজুহাতে চাঁদা নিয়ে যায়। পরিকল্পিতভাবে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।


মামলা না করার বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মামলা করলে সেখানে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। ইতোমধ্যে বিষয়টি জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে এবং তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে আশা প্রকাশ করেন।


তিনি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার কথাও জানিয়েছেন। তবে দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পঞ্চানন্দ সরকার জানান, অধ্যক্ষ থানায় এসে জিডি করতে চাননি; অনলাইনে জিডি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এ ধরনের বিষয়ে অনলাইনে জিডি করার সুযোগ না থাকায় তা করা সম্ভব হয়নি।


ওসি আরও জানান, নারী শিক্ষক আলেয়াকে স্যান্ডেলপেটা করা শাহাদ আলীর বিরুদ্ধে আগেই একটি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা ছিল। ওই পরোয়ানা নিয়েই তিনি কলেজে এসে ঘটনাটি ঘটান। পুলিশ আগে এ বিষয়ে অবগত না থাকলেও বর্তমানে বিষয়টি জানা গেছে এবং তাকে গ্রেফতারে পুলিশের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও কাজ করছে।


এ ঘটনার পর ইউনিয়ন বিএনপির সহ সভাপতি আকবর আলীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে শাহাদ আলীর কোনো সাংগঠনিক পদ না থাকায় তার বিরুদ্ধে দলীয় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।


এদিকে শিক্ষক আলেয়া খাতুন জানান, রামেক হাসপাতাল থেকে ছুটি নিয়ে তিনি একটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন। কলেজে যাওয়ার মতো শারীরিক অবস্থার এখনো উন্নতি হয়নি। 


এ ঘটনায় কোনো আইনি ব্যবস্থা নেবেন কি না-জানতে চাইলে তিনি বলেন, সুস্থ হওয়ার পরই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে তারা আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষেই আছেন।