মেয়েদের হলের সামনে নাচানাচি করায় সিনিয়রদের জুনিয়রের গালি, রাবি’র হলে উত্তেজনা
জুনিয়র এক শিক্ষার্থী কর্তৃক সিনিয়র শিক্ষার্থীদের গালি দেওয়াকে কেন্দ্র করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ হবিবুর রহমান হলে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। শুক্রবার (৮ মে) বিকেল থেকে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়। পরে শনিবার বিকেলে প্রক্টরের উপস্থিতিতে ঘটনাটি মীমাংসা হওয়ার পরেও রবিবার জুনিয়র শিক্ষার্থী প্রক্টর বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
গালি দেওয়া ওই জুনিয়র শিক্ষার্থীর নাম এবায়দুর রহমান খান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং শহীদ হবিবুর রহমান হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। তিনি একই হলের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের ‘বোকাচো দল’ বলে গলি দিয়েছেন।
হলের একাধিক শিক্ষার্থী জানান, গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার দুই দিনব্যাপী শহীদ হবিবুর রহমান হলের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের হল সমাপনী অনুষ্ঠান ছিল। এরমধ্যে শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে হল থেকে একটি আনন্দ র্যালি বের করা হয়। পুরো র্যালিতে সাউন্ড বক্সের তালে তালে নাচানাচিও করেন শিক্ষার্থীরা। র্যালিটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে আবার হলের সামনে এসে শেষ হয়।
র্যালির একপর্যায়ে শহীদ হবিবুর রহমান হলের শিক্ষার্থীরা তাপসী রাবেয়া ও রোকেয়া হলের মধ্যবর্তী সড়কে ১০-১৫ মিনিট নাচানাচি এবং ছবি তোলেন। একই সময়ে সেখানে আরও উপস্থিত ছিলেন সৈয়দ আমীর আলী হলের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরাও। তাঁরাও তাদের হল সমাপনীর আনন্দ র্যালীর অংশ হিসেবে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করছিলেন।
ওই সময়কার একটি ভিডিও ওইদিন দুপুরে শেয়ার করে এবায়দুর রহমান খান ক্যাপশন দেন, “ফ্রাস্ট্রেটেড পিপল, বোকাচো* দল”। এই ক্যাপশন ঘিরে শহীদ হবিবুর রহমান হলের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হন। পরে ওইদিন রাতে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষসহ হলের অন্যান্য শিক্ষার্থীরা বিষয়টি নিয়ে কথা বলার জন্য তাকে ডাকলে তিনি বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে দেখা করেননি।
এবিষয়ে শহীদ হবিবুর রহমান হলের আবাসিক এবং ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হাসিব হাসান বলেন, ছেলেরা যে শুধু মেয়েদের হলের সামনে নেচেছে, তা না। সম্পূর্ণ র্যালিতেই নাচানাচি হয়েছে। আর মেয়েদের হলের সামনে ছেলেদের নাচানাচিকে যৌক্তিক বলছি না। কিন্তু এই কলচারটা বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে। এরকম অনুষ্ঠানে মেয়েরাও ছেলেদের হলের সামনে এসে স্লোগান দেয়। এই বিষয়ে ওই ছেলেটা যেভাবে মন্তব্য করেছে বা গালি দিয়েছে, সেটা অনাকাঙ্ক্ষিত এবং চরম বেয়াদবি।
এদিকে পরেরদিন শনিবার (৯ মে) বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর, শহীদ হবিবুর রহমান হলের প্রভোস্ট ও হাউজ টিউটরদের উপস্থিতিতে অভিযুক্ত এবায়দুর রহমান খান দুঃখ প্রকাশ করেন। এছাড়া বিতর্কিত পোস্টটি সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি দুঃখ প্রকাশ করে আরেকটি পোস্ট করেন তিনি।
সেই পোস্টে আগের পোস্টের সেই ভিডিও শেয়ার করে তিনি লিখেছেন, “দুইদিন আগে এই পোস্টের সমালোচনা করতে গিয়ে আমার শব্দচয়নে অনেক সিনিয়র ভাই অত্যন্ত মনক্ষুন্ন হয়েছেন। প্রকৃত অর্থে আপনাদের কাউকে পার্সোনালি অ্যাটাক করা উদ্যেশ্য না, উদ্দেশ্যে হলো যে বা যারা এধরনের মানসিকতা রাখেন সেই মানসিকতার সমালোচনা করা। এজন্যে (শুধুমাত্র শব্দচয়নের জন্যে, এই কালচারের বিরোধিতা সবসময় করবো) আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।..”
সেই পোস্টের কমেন্টে তিনি সিনিয়রদের উদ্দেশ্যে একটি প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি লিখেছেন, “যে সকল সিনিয়র আমাকে ঝড়-বৃষ্টির রাতে সাড়ে ১২টা থেকে রাত ৩ টা অব্দি জোরপূর্বক হলে এসে তাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করতে বলেন (আমি ছিলাম ক্যাম্পাসের বাইরে) যেখানে তারা সবাই মারমুখী অবস্থায় ছিলেন, আবার না আসলে পরবর্তীতে দেখে নেওয়ার, মারার এবং সিট থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন এবং পরবর্তীতে কোনো প্রকার লিগ্যাল ভ্যালিডিটি ছাড়া মব ক্রিয়েট করে মাঝরাতে আমার জিনিসপত্র রুম থেকে ফেলে দিয়েছেন, তারা কি এর জন্যে দুঃখ প্রকাশ করবে?”
এদিকে ঘটনাটি সমাধান হয়ে যাওয়ার পরে শনিবার রাতে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে ‘রাবিতে ছাত্রী হলের সামনে নাচানাচির সমালোচনা, শিক্ষার্থীকে হ/ত্যার হু/মকি’, ‘রাবিতে মেয়েদের হলের সামনে নাচানাচি নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট, হত্যার হুমকি’ শিরোনামে খবর প্রকাশ করা হয়েছে।
কে কখন এবং কীভাবে হত্যার হুমকি দিয়েছে জানতে চাইলে এবায়দুর রহমান খান বলেন, “শুক্রবার রাতে যখন আমাকে একাধিক নাম্বার থেকে কল দিয়ে দেখা করতে হলে যাওয়ার জন্য বলা হয়, তখন হুমকি দেওয়া হয়েছে।”
হুমকির কোনো রেকর্ডিং আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি কিছু রেকর্ডিং সরবরাহ করেন। যার একটিতে একজনকে বলতে শোনা যায়, “তুই বেয়াদবি করেছিস। তুই অ্যাপোলজি করবি কিনা সেটা বল। তুই আসবি কিনা সেটা বল। না বললে বলে দে। ঠিক আছে। কাল যেন তোকে হলে না দেখি। আর যদি দেখি, তাহলে কিন্তু তোর বিচিমিচি কান্ধে উঠে যাবি।”
আরেকটি রেকর্ডিংয়ে আরেকজনকে বলতে শোনা যায়, “এই ছোটো ভাই,... এখন বাঁইচবার যদি চাস, এখন আয়। আর যদি চাস হলে থাকবো না, তাহলে তুই দেখেকগা, তোর নিয়ম তুই বোজেকগা। সোজা হিসাব।”
হত্যার হুমকির অভিযোগটি প্রক্টর ও প্রভোস্টের উপস্থিতিতে হওয়া মিটিংয়ে তুলেছিলেন কিনা জানতে চাইলে এবায়দুর রহমান খান বলেন, “আমাকে মারার হুমকির বিষয়টি প্রভোস্ট এবং প্রক্টর দুইজনই জানতেন। কিন্তু মিটিংয়ে আমার বিপরীতে ৩০-৪০ জন ছিল, অথচ আমি একা। ওখানে যখন আমি আমার তোষক ফেলে দেওয়া এবং হুমকি দেওয়ার বিষয়গুলো তুলি, তখন প্রক্টর এবং প্রভোস্ট স্যার আমাকে বলেন, ‘তুমি জুনিয়র। তুমি ভুলে যাও এগুলো।’ পরবর্তীতে এটাও বলেছেন, ‘তুমি ভুল শব্দচয়ন করেছো বলেইতো তোমার তোষকে হাত দিয়েছে। দোষতো তোমার। অতএব এখানে আমাদের কিছু করার নাই।’”
এবায়দুর অভিযোগ করে বলেন, “পরবর্তীতে প্রভোস্ট স্যার সবার সামনে আমাকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, ‘এই ছেলে যদি পরবর্তীতে আবারও কোনো সিনিয়রের সাথে ন্যূনতম পরিমাণ বেয়াদবি করে, তাহলে তোমরা আমাকে বলবা। আমি ওকে হল থেকে বের করে দিবো।’ মানে ওখানে আমাকে জাস্ট অপমান-অপদস্থ করা হয়েছে সবার সামনে।”
তিনি আরও বলেন, “পোস্ট করার ৬-৭ ঘন্টার মধ্যে আমি ক্যাপশন পরিবর্তন করেছিলাম। তারপরও আমাকে ছাড় দেওয়া হয় নাই। আমাকে ওখানে (মিটিংয়ে) নিয়ে ক্ষমা চাওয়ানো হয়েছে। এবং পরবর্তীতে প্রভোস্ট স্যার আমাকে আরেকটা সলিউশন দিয়েছে, ‘তুমি এখানে ক্ষমা চেয়েছো। তুমি ফেসবুক আইডি থেকে আবার পোস্ট করবা, আমি আমার সিনিয়র ভাইদের কাছে ক্ষমা চেয়েছি। তারা আমাকে মাফ করে দিয়েছে।’ এটা কখনো একটা প্রশাসনের ডিসিশন হতে পারে? আমি অভারঅল এই বিচার বা মীমাংসায় সন্তুষ্ট না।”
মীমাংসার পরে নিউজ করালেন কেনো জানতে চাইলে তিনি বলেন, “নিউজের জন্য তথ্যগুলো মিটিংয়ের আগেই কয়েকজন সাংবাদিককে দেওয়া ছিল। মিটিং শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরে নিউজগুলো পাবলিশ হয়েছে। এমন না যে মিটিং শেষে আমি নিউজ করিয়েছি। সাংবাদিকদের নিউজ করতে কিছুটা দেরী হয়েছে। কিন্তু আমি আগেই চেয়েছিলাম যে এগুলো সামনে আসুক।”
এই বিষয়ে শহীদ হবিবুর রহমান হল সংসদের ভিপি আহমাদ আহসানুল্লাহ ফারহান বলেন, “ওই ছেলেটা মিটিংয়ে ভুল স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেছে। দুঃখ প্রকাশ করে ফেসবুকে পোস্টও করেছে। কিন্তু আবার মীমাংসা মানবে না বলে নিউজও করিয়েছে। এজন্য সিনিয়র শিক্ষার্থীদের (১৯-২০ শিক্ষাবর্ষ) মধ্যে আবার অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। আমি তাঁকে আমার মতো করে বুঝিয়েছি। এখন সে তাঁর দাবিতে অনড়। সে প্রয়োজনে আরও আগাতে চাচ্ছে।”
হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মো. মোতাহার হোসেন বলেন, “সে যদি আগেই বিষয়টা নিয়ে কাউকে নিউজ করার জন্য বলে এসে মিটিংয়ে আসে, তাহলে তাঁর মধ্যেই সমস্যা আছে। এটা দ্বিচারিতা হয়ে গেলো না? সে যদি নিউজই করাবে, তাহলে সে বলতে পারতো, ‘স্যার আমি মীমাংসা করবো না। আমি আইনগত (ফৌজদারি) ব্যবস্থা নিবো।’ কিন্তু আমি এখন পর্যন্ত জানি, সে আমাদের সিদ্ধান্ত অ্যাক্সেপ্ট করেছে। সে যদি আবারও কিছু করতে চায় এবং আমাদের লিখিত অভিযোগ দেয়, তাহলে আমরা পুনরায় তদন্ত কমিটি করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিবো।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান বলেন, “শনিবার আমরা একটা মীমাংসা করে দিয়েছিলাম। এরপর সে আজ আবার একটা লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। আমরা প্রয়োজনে নতুন তদন্ত কমিটি করে বিষয়টি আবারও খতিয়ে দেখবো।”