সোমবার, জুন ২২, ২০২৬

সড়কে রক্তঝরা বাস্তবতা : আর কত মৃত্যু হলে হবে নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন?

সোনার দেশ ডেস্ক ১১ মে ২০২৬ ০১:৫৬ অপরাহ্ন জাতীয়
সোনার দেশ ডেস্ক ১১ মে ২০২৬ ০১:৫৬ অপরাহ্ন
সড়কে রক্তঝরা বাস্তবতা : আর কত মৃত্যু হলে হবে নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন?

বাংলাদেশে সড়কে বের হওয়া এখন যেন প্রতিদিনের এক নীরব যুদ্ধ। কেউ অফিসে যাচ্ছেন, কেউ স্কুল-কলেজে, কেউবা পরিবারের কাছে ফিরতে রওনা হয়েছেন—কিন্তু নিরাপদে ঘরে ফেরা এখন আর নিশ্চিত নয়। প্রতিদিন সড়কে ঝরে পড়ছে প্রাণ, পঙ্গুত্ব বরণ করছেন অসংখ্য মানুষ। অথচ এসব মৃত্যুর বড় অংশই প্রতিরোধযোগ্য। তবু কেন থামছে না এই মৃত্যুমিছিল?

সোমবার (১১ মে) ব্র্যাকের সড়ক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিভাগ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

ব্র্যাক জানায়, ২০২৪ সালের তথ্য পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে নতুন করে সামনে এনেছে। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর দেশে ৬ হাজার ৯২৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৭ হাজার ২৯৪ জন এবং আহত হয়েছেন ১২ হাজার ১৯ জন। নিহতদের মধ্যে ২ হাজার ৬০৯ জন মোটরসাইকেল আরোহী, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৩৬ শতাংশ। এ ছাড়া প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৫৩৫ জন পথচারী। শিশু নিহত হয়েছেন ১ হাজার ১৫২ জন।

এই সংখ্যা কেবল পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি ভেঙে যাওয়া পরিবার, থেমে যাওয়া স্বপ্ন এবং অনিশ্চয়তায় ডুবে যাওয়া ভবিষ্যৎ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নিহতদের বড় অংশই তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা এখন শুধু জননিরাপত্তার সংকট নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি।

গত সাড়ে পাঁচ বছরে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৫ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। একই সময়ে আহত হয়েছেন ৫৩ হাজারের বেশি মানুষ। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য সংকট।

দুর্ঘটনার কারণগুলো আমাদের অজানা নয়। বেপরোয়া গতি, অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং ক্লান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো—এসব বহুদিনের বাস্তবতা। কিন্তু সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা আইনের দুর্বল প্রয়োগে। বিদ্যমান সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ মূলত পরিবহন ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিলেও নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এতে অনুপস্থিত।

বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরেই একটি পৃথক ও আধুনিক ‘রোড সেফটি আইন’ প্রণয়নের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাদের মতে, বর্তমান আইন ‘সেইফ সিস্টেম এপ্রোচ’ অনুসরণ করে না। অথচ জাতিসংঘের সুপারিশ অনুযায়ী নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে প্রয়োজন পাঁচটি মূল স্তম্ভ—নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ গতি, দায়িত্বশীল সড়ক ব্যবহারকারী এবং দুর্ঘটনা পরবর্তী কার্যকর চিকিৎসা ব্যবস্থা।

বাংলাদেশে এখনো গতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা নেই। ডিজিটাল নজরদারি দুর্বল, সড়কে স্পিড মনিটরিং প্রায় অনুপস্থিত, আর ট্রাফিক আইন ভঙ্গের বিচার প্রক্রিয়াও ধীর। ফলে অপরাধীরা অনেক ক্ষেত্রেই দায়মুক্তি পেয়ে যায়। এই সংস্কৃতি সড়কে বিশৃঙ্খলাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।

রাজধানী ঢাকার পরিস্থিতিও ভয়াবহ। ফুটপাত দখল, অপরিকল্পিত গণপরিবহন, অকার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং পথচারীবান্ধব অবকাঠামোর অভাব নগরবাসীকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে ফেলছে। ফুটওভার ব্রিজ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা ব্যবহার অনুপযোগী বা অব্যবস্থাপনায় ভরা। শিশু, নারী, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।

এ অবস্থায় শুধু দুর্ঘটনার পর শোক প্রকাশ করে দায় শেষ করলে চলবে না। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গীকার, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং কার্যকর সংস্কার। অবিলম্বে জাতিসংঘের সেইফ সিস্টেম এপ্রোচ ভিত্তিক একটি পৃথক ও সমন্বিত নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করতে হবে।

সেই আইনে গতি নিয়ন্ত্রণ, চালকের মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতা যাচাই, ডিজিটাল লাইসেন্স ব্যবস্থা, যানবাহনের মান নিয়ন্ত্রণ, পথচারী সুরক্ষা এবং দুর্ঘটনা তদন্তের বাধ্যতামূলক বিধান থাকতে হবে।

একইসঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সিসিটিভি নজরদারি, স্বয়ংক্রিয় জরিমানা ব্যবস্থা, স্পিড ক্যামেরা এবং ডিজিটাল ড্রাইভিং লাইসেন্স যাচাই কার্যকর করা গেলে দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এসব ব্যবস্থার ইতিবাচক ফল মিলেছে। তবে শুধু আইন করলেই হবে না; প্রয়োজন নাগরিক সচেতনতা। ট্রাফিক আইন মেনে চলা, হেলমেট ও সিটবেল্ট ব্যবহার, নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করা—এসবকে সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে এ ক্ষেত্রে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

সবশেষে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—আর কত প্রাণ গেলে আমরা বুঝব, নিরাপদ সড়ক কোনো বিলাসিতা নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার?- আগামীর সময়