চার জেলা সীমান্তের পদ্মার চর সন্ত্রাসীদের অভায়রণ্য
রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও কুষ্টিয়া জেলার সীমান্তের পদ্মার চরে সন্ত্রাসীদের অভায়রণ্য হিসেবে গড়ে উঠেছে। এই সীমান্তে কারণে-অকারণে গুলির শব্দ শোনা যায় বলে স্থানীয়রা জানান।
রাজশাহীর বাঘায় পদ্মার চরে সোমবার গভীর রাতে গোলাগুলিতে দু’জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়নের কালিদাসখালি চরে এ ঘটনা ঘটে।
গুলিবিদ্ধ দুজনের একজন স্বপন বেপারী (৪০), অন্যজনের নাম জিয়াউল। পুলিশ বলছে, স্বপন বেপারীকে গুলি করে অপহরণ করেছে সন্ত্রাসীরা। তাঁর চারদিনেও সন্ধান পাওয়া যায়নি। সন্ধানে অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।
পদ্মার বিশাল চর রয়েছে রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও কুষ্টিয়া জেলার সীমান্ত এলাকায়। এই চরের নিয়ন্ত্রণে গড়ে উঠেছে কাঁকন বাহিনীসহ ১১টি বাহিনী। গত বছর ২৭ অক্টোবর এই চরে গোলাগুলিতে নিহত হন তিনজন। পরে ৭ নভেম্বর রাতে পুলিশ, র্যাব, নৌবাহিনী, এপিবিএনসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর এক হাজার ২০০ সদস্য এই চরে অভিযান চালায়।
অপারেশন ‘ফার্স্ট লাইট’ নামে ওই অভিযানে ৬৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু এর পরও সন্ত্রাসী বাহিনীর দাপট কমেনি। উল্টো সাম্প্রতিক সময়ে সন্ত্রাসীদের তৎপরতা ফের বেড়ে গেছে। বিশেষ করে কাঁকন বাহিনীর তাণ্ডব ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
গত ১১ মে বাঘার পদ্মার মধ্য চকরাজাপুর চরের আলতাফ খামরু, কামাল হোসেন খামরু, জামাল উদ্দিন, আসাদুল হক, বাবলু হোসেন ও আনারুল ইসলাম ১৭৬টি গরু নিয়ে পলাশি-ফতেপুর মাঠে চরাতে যায়।
এ সময় কাঁকন বাহিনীর ছয়-সাতজন সন্ত্রাসী ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এতে রাখালরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। সন্ত্রাসীরা তাঁদের গুলি করে হত্যার হুমকি দিলে প্রাণভয়ে তাঁরা গরু রেখে চলে আসেন। পুলিশ বিজিবির অভিযানে পরে লুট হওয়া গরু উদ্ধার করা হয়।
সর্বশেষ গত সোমবার রাতে গুলি করে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয় স্বপন বেপারীকে। ওই দিন রাত ১২টার দিকে পদ্মা নদী হয়ে ট্রলারযোগে কালিদাসখালি চরের দিকে আসছিল একদল ডাকাত। ওই সময় স্বপন বেপারী তাদের লক্ষ্য করে টর্চলাইট মারে। এতে ডাকাতরা ক্ষিপ্ত হয়ে স্বপনকে গুলি করে। গুলিতে স্বপন ও জিয়াউল আহত হন। কিন্তু পরে আর আহত স্বপনকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। স্বপনকে উদ্ধারে পুলিশ বুধবার সকালেও চরে অভিযান চালিয়েছে।
চকরাজাপুর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে বালুরঘাট রয়েছে। এই ঘাটকে কেন্দ্র করে চরের দখল নিয়ে বিভিন্ন সময় হামলার ঘটনা ঘটছে।’ চকরাজাপুর ইউনিয়নের বিশাল চরের পূর্বপাশে নাটোর জেলার লালপুর, পাবনা জেলার ঈশ্বরদী ও কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর এবং ভেড়ামারা উপজেলার কয়েকটি চর রয়েছে। এই চরগুলো নিয়ন্ত্রণ করে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী রোকনুজ্জামান কাঁকন ওরফে ইঞ্জিনিয়ার কাঁকন। তার বাহিনী এই চরের অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এর বাইরে রয়েছে মন্ডল বাহিনী, টুকু বাহিনী, সাঈদ বাহিনী, লালচাঁদ বাহিনী, রাখি বাহিনী, শরীফ কাইগি বাহিনী, রাজ্জাক বাহিনী, চল্লিশ বাহিনী, বাহান্ন বাহিনী, সুখচাঁদ ও নাহারুল বাহিনীসহ ১১টি বাহিনী। এই বাহিনীগুলো বাঘা ও কুষ্টিয়ার বালুঘাট, চরের বালু, চরের খড়, ফসল, গরু, চরের জমি দখল, চাঁদাবাজি, খেয়াঘাট সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করে।
একটি সূত্র জানায়, কাঁকন বাহিনীর অন্তত ৬০০ সক্রিয় সদস্য রয়েছে। এরা পুরো চর নিয়ন্ত্রণ করে। চাঁদাবাজি, লুট, খুন থেকে শুরু করে সব অপকর্মের অন্যতম হোতা কাঁকন বাহিনী।
এ বিষয়ে বাঘা থানার ওসি সেরাজুল হক বলেন, ‘সর্বশেষ গত সোমবারের ঘটনায় রাতেই পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। কিন্তু এখনো স্বপনের খোঁজ মেলেনি। তাঁকে গুলি করা হয়েছে। তবে কী কারণে গুলি করা হয়েছে সেটি এখনো জানা যায়নি।’
এই চর চারটি জেলার মধ্যে পড়েছে। এটি একটি দুর্গম এলাকা। ফলে অপরাধীরা সহজে অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে। তারা একের পর এক অপকর্ম করে দুর্গম এলাকায় চলে যায়। এ কারণে তাদের চিহ্নিত করা সহজ না।’