সোমবার, জুন ২২, ২০২৬

ইদুল আজহায় উত্তাপহীন বগুড়ার মসলার বাজার!

দীপক সরকার, বগুড়া ২২ মে ২০২৬ ১১:২৬ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
দীপক সরকার, বগুড়া ২২ মে ২০২৬ ১১:২৬ অপরাহ্ন
ইদুল আজহায় উত্তাপহীন বগুড়ার মসলার বাজার!

পবিত্র ইদুল আজহা আসতে আরমাত্র পাঁচদিন বাকি। কোরবানি ইদের আত্মসুদ্ধির জন্য যারা পশু কোরবানি দিবেন, তাদের অধিকাংশই  পশু কিনেছেন, যাদের কেনা হয়নি তারা ছুটছেন হাটে ও খামারীদের বাড়িতে বাড়িতে। বাসায় রাখা পশু জবাই ও মাংস-হাড় কাটার অস্ত্র ঘষামাজা করে নেওয়া হচ্ছে। সাধ্য অনুযায়ী যে যার মতো কোরবানির আয়োজনটা অনেকটাই গুছিয়ে নিয়েছেন। শুধুমাত্র শেষ কেনাকাটার তালিকার রয়েছে রকমারি মসলা। কারণ এ ইদে মসলার কোনো বিকল্প নেই। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে প্রতিটি পরিবারের তালিকায় একটু বেশি পরিমাণ মসলার চাহিদা থাকে।


গৃহিণীদের চাহিদামত পরিবারের অধিকাংশ কর্তারা এখন ব্যস্ত রয়েছে মসলা কেনায়। তালিকা (ফর্দ্দ) ধরে ধরে দোকান  থেকে মসলা কিনছে। কোরবানি ইদে যেহেতু মসলার প্রয়োজনীয়তা বেশি, আর এ সুযোগে বেশ গরম হয়ে উঠেছে মসলার বাজার। রকমারি মসলা বিক্রি হচ্ছে প্রায় দিগুণ দামে।


খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বগুড়া শহরের ফতেহ আলী বাজার, রাজাবাজারসহ জেলার বিভিন্ন বাজারে এখন মসলার দামে ভিন্ন চিত্র। বরাবরই বগুড়ায় মসলার বাজার চড়াদাম থাকলেও চোরাইপথে সব ধরনের মসলা বগুড়াতে আসায় উত্তাপ নেই বাজারে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, চোরাইপথে শুধু বগুড়াতেই নয়- রাজধানী ঢাকাতেও যাচ্ছে এসব মসলা। ফলে, সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব। সহজেই লাখোপতি হচ্ছে চোরাইকারবারিরা।


জানা গেছে, ইদকে সমনে রেখে বগুড়ার মসলার বাজারে শুরু হয়েছে মৌসুমি ব্যস্ততা। কোরবানির রান্নার প্রস্তুতিতে এখন থেকেই মসলা কিনছেন অনেক পরিবার। তবে বগুড়ার বাজারে দাম বাড়েনি সব ধরনের মসলার। ইদকে ঘিরে মসলার চাহিদা থাকলেও পাইকারি বাজারে ক্রেতা কম। কারণ পাশের দেশ থেকে চোরাইপথে মসলা আমদানি করছে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। তারা সরাসরি এসব মসলা পাইকারি এবং খুচরা বাজারে বিক্রি করছেন। এতে করে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পাশাপাশি সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব।


পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, কোরবানি ইদকে সামনে রেখে মসলার বৃহৎ অংশ এই বন্দর দিয়ে আমদানি করা হচ্ছে। ইদে মসলার দাম ভোক্তাদের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে এবং চাহিদা থাকায় হিলি স্থলবন্দর দিয়ে মসলা জাতীয় পণ্যের আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে আমদানি হচ্ছে আদা, জিরা, ছোট এলাচ, মহুরি, কিসমিস, কাজুবাদামসহ বিভিন্ন ধরনের মসলা। আমদানি করা এসব মসলা নিয়মিত বিক্রি হচ্ছে বন্দর থেকে। প্রতিদিন বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাচ্ছে। এছাড়াও চোরাইপথে মসলা আসায় পাইকারি বাজারে বিক্রি কমেছে। সরকার যদি এ বিষয়ে সঠিক পদক্ষেপ না নেয় তাহলে লাখ লাখ টাকা রাজস্ব হারাবে দাবি করেন ওই ব্যবসায়ী।


শুক্রবার (২২ মে) সকালে বগুড়ার ফতেহ আলী ও রাজা বাজারসহ শহরের বেশকিছু বাজার ঘুরে দেখা যায়, গত বছর সাদা এলাচ ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা কেজিতে বিক্রি হলেও এবার তা মানভেদে ৪ হাজার ৪শো টাকা থেকে ৪ হাজার ৮শো টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কালোএলাচ গত বছর ২ হাজার ৬শো টাকা থেকে ৩ হাজার টাকা কেজিতে বিক্রি হলেও এবার তা আড়াই হাজার টাকা কেজিতে বিক্রি হতে দেখা যায়। লবঙ্গ গত বছর ১ হাজার ৩৪০ টাকা কেজিতে বেচাকেনা হলেও এবার ১ হাজার ৬শো টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।


দারুচিনি গত বছরের দাম ৬শো টাকা কেজি, গুলমরিচ গত বছর ১ হাজার ২শো থেকে ১ হাজার ৪শো টাকা কেজি বিক্রি হলেও এবার তা ১ হাজার ৩শো টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়, বজ গত বছর ৬শো থেকে ৮শো টাকা কেজিতে বিক্রি হলেও এবার তা দাম কমে ৫শো টাকায় বেচাকেনা হতে দেখা যায়। হলুদের গুঁড়ার কেজিতে ৮০ টাকা পর্যন্ত দাম কমে ২৮০ টাকা, মরিচের গুঁড়া ৪৫০ থেকে ৪৮০ টাকা, ধনিয়ার গুঁড়া ৩শো এবং জিরার গুঁড়া ৯শো টাকা কেজি।


এছাড়াও আদা-রসুন ও পেঁয়াজের দামও গত বছরের তুলনায় এবার কম লক্ষ্য করা গেছে। আদা গত বছর মানভেদে ১শো থেকে ১২০ টাকা কেজি বিক্রি হলেও এবার ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা, রসুন ১০০ থেকে ১৫০ টাকায় গত বছর বেচাকেনা হলেও এবার তা ১০০ থেকে ১২০ টাকা এবং পেঁয়াজের কেজিতে ১৫ টাকা পর্যন্ত দাম কমে মানভেদে ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বেচাকেনা হতে দেখা যায়।  


বগুড়া রাজাবাজার মসলা আমদানি কারক মো. মতিউর রহমান জানান, প্রতিবছর ইদুল আজহার আগে মসলার দাম বৃদ্ধি পায় তবে এবার সেটা ব্যতিক্রম। জিরা, এলাচসহ প্রতিটি পণ্যের দাম কমেছে। গত কয়েক মাস আগেও মসলার যে দাম ছিল বর্তমানে তা অনেকটা কম।


তিনি বলেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী চোরাইপথে মসলা আমদানি করছে। যার ফলে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন। এছাড়া সরকার লাখ লাখ টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। প্রতি বছর এই সময় বেচাকেনা সরগম থাকে। কিন্তু এ বছর তার উল্টো। কারণ চোরাইকারবারিরা খুচরা বিক্রেতাদের কাছে অবৈধভাবে সরাসরি এসব মসলা বিক্রি করছে।


বগুড়া পৌর শহরের রেল বাজার এলাকার মসলা ব্যবসায়ী কার্তিক চন্দ্র রায় বলেন, দামের এই ওঠানামার কারণে ব্যবসায়ীরা কেউই অতিরিক্ত মসলা স্টক করছেন না। তবে ভারতে এবার অবাধে মসলা আসার কারণে বাজারদর অনেকটাই স্থিতিশীল। তবে আমদানি বেড়েছে। বাজার হয়তো নিয়ন্ত্রন রয়েছে। ক্রেতারাও খুশী। ফতেহ আলী বাজারে বেসরকারি চাকুরীজীবি ইফতেখারুল আলম দম্পতি মসলা কিনতে এসেছিলেন। তিনি জানান, ইদুল আযহার সময় বেশীরভাগ সময়েই দেখে এসেছি, মসলার দাম বাড়ে। কিন্তু এবার বগুড়ায় মসলার বাজার স্থিতিশীল রয়েছে। দাম বাড়েনি, আগের মতই আছে। কিনেও সাচ্ছন্দ্যবোধ করছি।


এদিকে হিলি স্থলবন্দর কাস্টমস বিভাগ সুত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ মে পর্যন্ত জিরা, ছোট এলাচ, কাজুবাদাম এবং কিসমিস মিলিয়ে প্রায় ২৬ হাজার মেট্রিক টনের অধিক মসলা ভারত থেকে এই স্থল বন্দর দিয়ে আমদানি হয়েছে। এরমধ্যে শুধু জিরা ও ছোট এলাচের পরিমাণ সাড়ে ৭ হাজার মেট্রিক টন।


জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের বগুড়া জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মেহেদী হাসান জানান, ‘এবার বাজার অনেকটাই স্থিতিশীল। এলাচের দাম আমদানি-নির্ভর হওয়ায় কিছুটা বেশি, তবে তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে নয়। তবে ইদের আগ পর্যন্ত বগুড়ার রাজাবাজার ও ফতেহ আলী বাজারে নিয়মিত বাজার মনিটরিং চালানো হবে। তাছাড়া ভেজাল বা নিম্নমানের পণ্য পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।