বড়াল নদী খনন : প্রতিশ্রুতির গন্ডি না পেরোতেই জনমনে হতাশা
রাজশাহীর চারঘাট ও আশপাশের জনপদের জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত বড়াল নদী খনন কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে কেবলমাত্র প্রতিশ্রুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে। এতে করে স্থানীয় জনগণের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। নদীটি পুনরুদ্ধারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টাসহ একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তির ঘোষণা বারবার এলেও বাস্তব অগ্রগতি না থাকায় পরিবেশ ও কৃষি খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব বাড়ছে।
বড়াল নদী তীরবর্তী এলাকায় একাধিক কৃষক জানান, একসময় বড়াল নদী ছিল এই এলাকার কৃষি, মৎস্য আহরণ এবং নৌ যোগাযোগের প্রধান ভরসা। কিন্তু দীর্ঘদিনের অবহেলা, পলি জমে নদী ভরাট হওয়া এবং নিয়মিত খননের অভাবে নদীটি এখন অনেক স্থানে খালে পরিণত হয়েছে। বর্ষা মৌসুমে জলধারণ ক্ষমতা কমে যাওয়ায়- একদিকে যেমন জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে দেখা দিচ্ছে পানির তীব্র সংকট। শুষ্ক মৌসুমে বড়ালে পানি শুকিয়ে যাওয়ায় কৃষিখেতে পানি দিতে অসুবিধা হয়। কৃষকদের তাই যত দ্রুত সম্ভব বড়াল নদী খনন করা প্রয়োজন বলে জানান উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আল মামুন হাসান।
সরেজমিনে গিয়ে উপজেলার সরদহ ইউনিয়নের ঝিকরা গ্রামের কৃষক রফিক জানায়, সেচের জন্য নদীর পানির উপর নির্ভরতা কমে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ভুগর্ভস্থ পানির উপর চাপ বাড়ায় টিউবওয়েলের ব্যবহারও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশেগত ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে ধান ও সবজি চাষে পানির অভাব এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পরিবেশবিদরা মনে করছেন বড়াল নদী খনন না হওয়ায় এলাকার জীববৈচিত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নদীভিত্তিক ইকোসিস্টেম যেমন গাছপালা, মাছ ইত্যাদির প্রজনন ব্যবস্থা কমে গেছে, পাখির বিচরণও কমে এসেছে। একই সঙ্গে নদী তীরবর্তী সবুজায়ন হ্রাস পাচ্ছে।
স্থানীয় জনগণ ও সামাজিক সংগঠনগুলো একাধিকবার নদী খননের দাবি জানালেও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ধীরগতির কারণে সাধারণ মানুষের আস্থা কমেছে। তারা দ্রুত এবং কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন, যাতে করে বড়াল নদীর পুনরায় তার প্রাকৃতিক প্রবাহ ফিরে পায়।
বড়াল রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব মিজানুর রহমান জানান, চারঘাটের পদ্মা থেকে বাঘাবাড়ি পর্যন্ত প্রায় ১০টি নদী রয়েছে। পদ্মা থেকে বাঘাবাড়ি পর্যন্ত প্রায় ২২০ কি.মি. নদীপথের মধ্যে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। চারঘাট ও নাটোরে বড়াল নদীর উপর তৈরি হয়েছে দুটি স্লুইসগেট। এগুলো অপসারণ করা হলেই নদী আবারও প্রাণ ফিরে পাবে। এছাড়া সমন্বিত পরিকল্পনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত না করলে কেবল খনন কার্যক্রম দিয়ে নদীর টেকসই পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।
নাটোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রিফাত করিম সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, ইতোমধ্যে বড়ার নদী খননের জন্য ফিজিবিলিটি স্টাডি শেষে ৫২৮ কোটি টাকার একটি প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন হলে প্রথম ফেইজে বড়ালের ৪৮.৫ কি.মি., নারোদ নদের ৪৩ কি.মি. এবং মুসা খা নদীর ৬ কি.মি. পুন:খনন করা হবে।