ফুলের মুগ্ধতায় নগরী
উত্তর-পশ্চিম বাংলাদেশে যখন গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহ জেঁকে বসে এবং বরেন্দ্র অঞ্চলে শুষ্ক বাতাস বয়ে যায়, তখন নানা রঙের ফুলে রাজশাহী মহানগরীতে রঙে রঙে রূপটানে চোখ জুড়ায়, মুগ্ধতা ছড়ায়- প্রশান্তি ছুয়ে যায় মনে-প্রাণে। নগর-প্রকৃতির সবুজ প্রচ্ছদে ফুটে ওঠা এই রূপ লাবণ্য রোদের তীব্র দাহনকে ভ্রুকুটি জানায়। খরাপ্রবণ এই অঞ্চলে যখন তাপমাত্রা বাড়ে এবং তীব্রতর হয়, তখনই রাস্তার ধারে ও বিভাজকগুলোতে ঋতুভিত্তিক ফুলে ফুলে ভরে উঠে শহর-প্রকৃতি। রং-রঙে যা গ্রীষ্মের প্রখর আকাশের নিচে গাছ ও ফুলের ছোট ছোট করিডোর তৈরি হয়ে আছে।
প্রধান সড়ক, সংযোগস্থল ও আবাসিক রাস্তার ধারে সারিবদ্ধ ফুলগাছগুলো টকটকে লাল, সোনালি, বেগুনি, সাদা, গোলাপি ও হলুদ রঙের বিভায় ঋতুর কঠোরতাকে প্রশমিত করে ফুটে আছে। কৃষ্ণচূড়ার অগ্নিবর্ণ চোখ-ধাঁধানো রূপ রাজপথ জুড়ে ছড়িয়ে আছে, যেন রাস্তার উপর ঝুলন্ত অগ্নিশিখা। রাস্তার ধারের ডালপালা থেকে ঝাড়বাতির মতো সোনালু ফুলের থোকা ঝুলে আছে প্রকৃতির দুল হয়ে। বেগুনি জারুল ফুল রাস্তার মোড় ও শান্ত পাড়ার রাস্তাগুলোকে উজ্জ্বল করে তোলে, অন্যদিকে রাধাচুড়ার কমলা-লাল ফুল নগরীর দৃশ্যে অন্য রকম মুগ্ধতা যোগ করে।
বিভিন্ন সড়ক বিভাজকে যানবাহনের স্রোতের মাঝে শ্বেত-শুভ্র কাঠগোলাপ নীরবে ফুটে আছে লাস্যময়ী ভঙ্গিতে। যা চলতে পথে অবাক করা মুহূর্ত তৈরি করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চারপাশের রাস্তা থেকে শুরু করে ব্যস্ত বাণিজ্যিক সড়ক এবং আবাসিক এলাকা পর্যন্ত ফুলগাছগুলো গ্রীষ্মের দাবদাহ থেকে স্বস্তি চাওয়া পথচারি, সাইকেল আরোহী, রিকশাচালক ও যাত্রীদের মাথার উপর এক জীবন্ত চাঁদোয়া তৈরি করে আছে। রাস্তার বিভিন্ন বিভাজক বরাবর, যত্ন করে লাগানো ফুলগাছ কংক্রিটের মধ্য দিয়ে রঙের রেখার মতো নগরজুড়ে বিস্তৃত হয়েছে।
রাজশাহী মহানগরীর ফিরোজাবাদ থেকে চৌদ্দপাই পর্যন্ত চার লেনের মহাসড়ক। রাস্তার দুই পাশে আছে সারিবদ্ধ গাছ। তবে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ছে ছোটবনগ্রাম এলাকার সড়কের পাশে থাকা সোনালু ফুল। সড়কটি এখন যেন ক্যানভাসে আঁকা কোনো ছবি। রাস্তার দুই ধারে সারিবদ্ধভাবে ফুটে আছে সোনালু, জারুল আর কৃষ্ণচূড়া। গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে এই রঙিন ফুলের সমারোহ পথচারি ও পর্যটকদের দুচোখে জুড়িয়ে দিচ্ছে প্রশান্তি। প্রকৃতি যেন তার ঝুলি উজাড় করে দিয়েছে এই সড়কে। কোথাও সোনালুর হলুদ আভা ঝুলে আছে ঝাড়-লণ্ঠনের মতো, কোথাও জারুলের বেগুনি রঙে লেগেছে স্নিগ্ধ-মায়াবী ছোঁয়া, আবার এরই মাঝে টকটকে লাল কৃষ্ণচূড়া জানান দিচ্ছে নিজের আধিপত্য। তিন রঙের এই মিতালি সড়কটিকে রূপ-রঙে-ঢঙে অনন্যতা দিয়েছে।
সোনালী পাড়ের মতো ঝুলে আছে সোনালু। বাতাসের দোলায় সেই হলুদ ফুলের দুলুনি যেন তপ্ত দুপুরেও এক পশলা বৃষ্টির মত স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে দিচ্ছে। ঠিক পাশেই সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে রক্তরাঙা কৃষ্ণচূড়া। আগুনের মতো লাল সেই আভা দূর থেকেও পথচারীদের নজর কাড়ছে। কৃষ্ণচূড়ার ছায়াও যেন লাল চাদরের আস্তরণ। আর এই দুই রঙের মাঝে মায়াবী পরশ নিয়ে নিজেকে জানান দিচ্ছে বেগুনি জারুল।
নগরীর ভদ্রা থেকে তালাইমারি সড়কের সড়ক বিভাজকে শোভা পাচ্ছে বাগান বিলাস, অলকানন্দা, কলাবতী। তালাইমারী থেকে আলুপট্টি রাস্তায় সুগন্ধ ছড়াচ্ছে দোলনচাঁপা, গন্ধরাজ, চম্পা, হাসনাহেনা ও রঙ্গন। কাশিয়াডাঙ্গা থেকে বহরমপুর রাস্তাটিও সেজেছে বর্ণিল সাজে। এই রাস্তায় সুগন্ধ আর সৌন্দর্য্য ছড়াচ্ছে গৌরিচোরা, রঙ্গন, টগর, মসুন্ডাসহ নানা প্রজাতির ফুল। কোর্টচত্ত্বর থেকে কাশিয়াডাঙ্গার রাস্তায় এখন রয়েছে টগর, মুসুন্ডা, কবরি, লালসালু, শিউলিসহ নানা প্রকার ফুল। এছাড়া নগরীর ঐতিহ্য চত্ত্বর থেকে নগর ভবন পর্যন্ত সড়কের পাশে শোভা পাচ্ছে কাঠগোলাপ, চেরি, লালসালু, কাঞ্চন, পলাশ, ডেইজি, কৃষ্ণচুড়াসহ নানা প্রজাতির ফুল। লক্ষ্মীপুর থেকে ঘোড়াচত্ত্বর এবং লক্ষ্মীপুর থেকে সিঅ্যান্ডবি পর্যন্ত সোনালু, জারুল, নডুসাই, কাঠগোলাপ ও জাকারান্দা জাতের ফুল সৌন্দর্য্য ছড়াচ্ছে।
এছাড়াও নগরীর বিভিন্ন সড়ক বিভাজকে শোভা পাচ্ছে বাগান বিলাস, কলাবতী, দোলনচাঁপা, রঙ্গন, জ্যাকারেন্ডা, অ্যালমুন্ডা, টগর, গাঁদা, গোলাপ, শিমুল, বেলী, শিউলি, কাঠগোলাপ প্রভৃতি নানা রকমের ফুল।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে নগর সড়কের দুই পাশে বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের গাছ লাগানো হয়েছে। এখন সেই গাছগুলো পূর্ণতা পেয়েছে। বিশেষ করে গত কয়েক দিন ধরে ফুলগুলো পূর্ণ প্রস্ফুটিত হওয়ায় এলাকাটি এক পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিকেলে প্রকৃতিপ্রেমিদের দেখা যাচ্ছে এখানে এসে ছবি তুলতে।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ২০১৯ সালে সৌন্দর্যবর্ধন উদ্যোগের অংশ হিসেবে নগরীর সড়কগুলোর ফুটপাথের দুই পাশে প্রায় ১০ হাজার গাছ লাগানো হয়েছিল। যার বেশিরভাগই ছিল ফুলের গাছ। প্রতি কিলোমিটারে বিভিন্ন প্রজাতির ফুলগাছ লাগানো হয়েছিল। রাস্তায় এবং সড়ক বিভাজকে বিভিন্ন আলংকারিক গাছ লাগানো হয়েছিল। সারা বছর ফুল ফোটে। রাস্তাগুলোতে এলইডি লাইটও লাগানো হয়েছে, যা রাতেও সৌন্দর্য ছড়ায়।
ব্যাচারিচালিত অটোরিকশাচালক জুবায়ের হোসেন বলেন, সারাদিন রিকশা চালাই। ক্লান্ত হলে কোনো গাছের নিচে আশ্রয় নিতে পারি। রাস্তায় ফুলগুলো দেখি, তখন মনটা ভালো হয়ে যায়। ছায়াতলে একটু জিরিয়ে নিই।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী নোমান ইমতিয়াজ বলেন, গ্রীষ্মের সবচেয়ে কঠিন দিনগুলোতে ফুল ফোটা গাছগুলো পরিবেশ বদলে দিয়েছে। যখন তাপমাত্রা অসহনীয় হয়ে ওঠে এবং সবকিছু শুষ্ক মনে হয়, তখন এই ফুলগুলো শহরকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
স্কুলশিক্ষক শফিকুল ইসলাম বলেন, রাজশাহীর রাস্তার ধারের সবুজায়ন নগরায়ন ও প্রকৃতির মধ্যে এক বিরল ভারসাম্য তৈরি করেছে। অনেক শহরে শুধু কংক্রিট, ধোঁয়া আর ধুলো। কিন্তু এখানে, প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও রাস্তার পাশে ফুল ফুটতে থাকে।
পরিবেশবিদদের মতে, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও পানি সংকটের কারণে সৃষ্ট পরিবেশগত চাপ থেকে নগরীকে রক্ষা করতে ফুলগাছগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা বলছেন, দেশের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এই অঞ্চলে গাছগুলো তাপ শোষণ করতে, ধূলিকণা কমাতে, ছায়া দিতে এবং বায়ুর মান উন্নত করতে সাহায্য করে।
পরিবেশকর্মী শহিদুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের অনেক শহরের তুলনায় রাজশাহীর অনেক রাস্তার ধারে এখনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে সবুজ রয়েছে। এই গাছগুলো শুধু সুন্দরই নয়, পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য অপরিহার্য। তাপ কমায়, অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং চাপপূর্ণ শহুরে পরিবেশে বসবাসকারী মানুষের জন্য মানসিক স্বস্তি তৈরি করে।