সোমবার, জুন ২২, ২০২৬

দুই বছরেও আলোর মুখ দেখলো না সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর

নিজস্ব প্রতিবেদক ০৪ জুন ২০২৬ ১১:০০ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ০৪ জুন ২০২৬ ১১:০০ অপরাহ্ন
দুই বছরেও আলোর মুখ দেখলো না সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর

৬ দশক আগে আগে রাজশাহীর সঙ্গে নৌপথে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের বাণিজ্য চলতো। সেই বাণিজ্য চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়।  এই নৌবন্দরে আবারও চালু হয় পণ্য আমদানি-রফতানি কার্যক্রম। চলে মাত্র ১০ দিন। এরপর আবারও বন্ধ হয়ে যায়। বার বার চালুর আশ্বাস দেওয়া হলেও এই বন্দরটি আলোর মুখ দেখছে না।


গোদাগাড়ী উপজেলার সুলতানগঞ্জের সঙ্গে ভারতের মুর্শিদাবাদের মায়া নৌবন্দরের দূরত্ব মাত্র ১৮ কিলোমিটার। ২০২৪ সালের ঢাকঢোল পিটিয়ে এই বন্দরের উদ্বোধন করা হয়েছিল। 


৫৯ বছর পর গেল বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি চালু হয় সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর। এর মধ্য দিয়ে এই রুটে ভারতের সঙ্গে পণ্য পরিবহণের সংযোগ পুনঃস্থাপন হয়। ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার মায়াবন্দর পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে চলাচল শুরু হয়। পাঁচটি নৌযানে আমদানি-রফতানি হয়েছে পাথর ও গার্মেন্টস ঝুট।


বছরের সবসময় এ নৌপথে পানি থাকলেও পণ্যবাহী বাল্ক বা লাইটার চলাচল করে। তাই নদী ড্রেজিংয়ে গুরুত্ব দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। স্বল্পমূল্যে পণ্য আমদানি ও পরিবহণ খরচ কম হওয়ায় দ্রুত এ বন্দরে গতি ফিরবে বলে প্রত্যাশা ব্যবসায়ীদের। ব্যবসায়ী নেতাদের দাবি, অন্যান্য বন্দরের তুলনায় স্বল্পমূল্যে পণ্য আমদানি ও পরিবহণ খরচে সাশ্রয় করতে পেরেছেন তারা। সেইসঙ্গে ব্যবসায়ী মহলে গুঞ্জন আছে, নৌবন্দরটি চালু হলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে সোনামসজিদ স্থলবন্দর পরিচালনা প্রতিষ্ঠানের ওপর।


জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও কাস্টমের দাবি অনুযায়ী অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ করতেও প্রস্তুত উদ্যোক্তারা। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, প্রশাসনের সদিচ্ছার অভাবেই স্থবির হয়েছে বন্দরটি। তবে, কিছুটা সময়ক্ষেপণ হলেও বন্দরটি নিয়ে আশাবাদী বিআইডব্লিউটিএ। ২০২৫ সালের ১ আগস্ট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নৌ পরিবহন উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন সুলতানগঞ্জ পোর্ট অব কল পরিদর্শন করেন। অবকাঠামো উন্নয়ন করে দ্রুত এটি চালুর নির্দেশনা দেন। কিন্তু এখনও তা বাস্তবায়ন হয়নি। 


আমদানি-রফতানিকারকদের অভিযোগ, এখন নদী ড্রেজিং ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করার পরও চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ স্থলবন্দরের পানামা ও এনবিআরের গা ছাড়া ভাবের কারণে ঝুলে আছে এই বন্দরের ভাগ্য। 


পাথর আমদানিকারক আমিনুল ইসলাম বলেন, নৌবন্দরে ব্যবসায়ীরা নিজ উদ্যোগে সব ধরনের অবকাঠামো উন্নয়ন করেছে। আমার তিনটি পণ্যবাহী জাহাজ সুলতানগঞ্জ নৌবন্দরে মাসের পর মাস পরে আছে। প্রতি মাসে ১৫ লাখ টাকা করে তাদের ভাড়া বাবদ দিতে হচ্ছে। এ অবস্থায় দ্রুত বন্দরটি চালু না হলে ব্যবসায়ীরা চরম বেকায়দায় পড়বে।


সুলতানুল ইসলাম নামের আরেক আমদানিকারক বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ স্থলবন্দরের পানামা মনে করেন এই বন্দরটি চালু হলে তাদের ব্যবসা নষ্ট হয়ে যাবে। এটি ভুল ধারণা। যার যেদিক দিয়ে সুবিধা হবে সেদিক দিয়ে পণ্য আনা নেয়া করবেন। সরকার দুই বন্দর থেকে রাজস্ব পাবেন। এজন্য সরকারের উচিত দ্রুত এখানে কাস্টমস বসিয়ে বাণিজ্য শুরু করা। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বন্দরটি চালু হলে পণ্য আমদানিতে ২০-২৫ শতাংশ ব্যয় কমবে। এছাড়া অনেক সময় কম লাগবে পণ্য আনা নেয়ায়। বহু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এই নৌ বন্দরকে ঘিরে। 


এদিকে বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক এ, কে, এম আরিফ উদ্দিন বলেন, সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও এনবিআর কেন এই নৌ বন্দরের চূড়ান্ত অনুমোদন দিচ্ছে না- তা উদ্বেগজনক। নৌবন্দর চালু না করার পেছনে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কোনো স্বার্থ রয়েছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা দরকার। তা না হলে এতদিনে জমজমাট থাকতো এই রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার সুলতানগঞ্জ নৌবন্দরটি।


রাজশাহী চেম্বার অব কমার্সের সিনিয়র সহসভাপতি শামসুর রহমান শান্তনু বলেন, এই নৌ বন্দর চালু হলে সরকার যেমন রাজস্ব আদায় করবে, তেমনি  ব্যবসায়িক জোন হিসেবে গড়ে উঠবে এই অঞ্চল। এই অঞ্চলের অর্থনীতির চাকা সচল হবে এই নৌবন্দরকে ঘিরে। ব্যবসায়ীদের নিয়ে আমরা এনবিআরের সঙ্গে বসবো। এই রুট চালু হলে রাজশাহীর ব্যবসায়ীরা বেশ উপকৃত হবে।  


ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও সরকারের উচ্চ পর্যায়ে এ বিষয়ে আলোচনা করা হবে। সরকার প্রধান চাইলে দ্রুতই চালু করা হবে এই বন্দরে দিয়ে বাণিজ্য কার্যক্রম।


১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের আগে সুলতানগঞ্জ-ময়া এবং গোদাগাড়ী-লালগোলা নৌঘাটের মধ্যে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালু ছিল। যুদ্ধের পর রুটটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে রাজশাহী থেকে ভারতের ধূলিয়ান পর্যন্ত ৭৮ কিলোমিটার নৌপথ অনুমোদন পেলেও পদ্মার নাব্য সংকটের কারণে তা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। পরে সংক্ষিপ্ত করে সুলতানগঞ্জ-ময়া রুট নির্ধারণ করা হয়। সুলতানগঞ্জ নৌবন্দর পুরোপুরি চালু করতে হলে এনবিআরের অনুমোদনের পাশাপাশি সংযোগ সড়কসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে।