পাবনায় রিয়া ধর্ষণ ও হত্যায় অভিযুক্তের বাড়ির আগুনে দগ্ধ ৩ জনের মৃত্যু
পাবনায় স্কুলছাত্রী রিয়া খাতুনকে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের জেরে অভিযুক্তের বাড়িতে দেয়া অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দগ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
মঙ্গলবার (৯ জুন) সকালে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুইজন এবং এর আগেরদিন সোমবার দুপুরে একজনের মৃত্যু হয়। অথচ কেউ বলতে পারছে না ওই বাড়িতে কে বা কারা আগুন দিয়েছিল।
নিহতরা হলেন, সদর উপজেলার ভাড়ারা ইউনিয়নের পূর্ব রাঘবপুর গ্রামের তজির উদ্দিন শেখের ছেলে সুমন শেখ (৩৭), পার্শ্ববর্তী নতুনপাড়া গ্রামের শুকুর হোসেনের ছেলে সাইফুল ইসলাম সাব্বির (২২) এবং একই এলাকার মৃত ইউসুফ আলীর ছেলে ইমন আলী ওরফে সাপু (১৯)। এদের মধ্যে সোমবার মারা যায় সুমন আর মঙ্গলবার মারা যায় সাব্বির ও ইমন।
পুলিশ ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, পাওনা টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে গত ২ জুন রাতে স্কুলছাত্রী রিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যা করে তার কথিত প্রেমিক নাইম সহ তিনজন। পরদিন ৩ জুন বিকেলে পাবনার ভাড়ারা এলাকার পদ্মা নদী থেকে স্কুলছাত্রী রিয়া খাতুন (১৫) এর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ময়নাতদন্ত শেষে ৪ জুন তার মরদেহ দাফন করা হয়।
দাফন শেষে উত্তজিত জনতার একাংশ অভিযুক্ত নাইম প্রামানিকের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় বাড়িতে দেখতে গিয়েছিলেন স্থানীয় ৫ জন তরুণ-যুবক। একপর্যায়ে বাড়ির সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়ে তারা দগ্ধ হন। তাদের উদ্ধার করে প্রথমে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাদের ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করেন চিকিৎসক। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সুমন, সাব্বির ও ইমনের মৃত্যু হয়।
এদিকে, মঙ্গলবার বিকেলে পূর্ব রাঘবপুর গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে এলাকাবাসী ও স্বজনদের সাথে কথা বলেন এ প্রতিবেদক। কিন্তু অভিযুক্ত নাইমের বাড়িতে কে বা কারা আগুন দিল, তা কেউ জানেন না। সবাই জানান, আগুন লাগা দেখেছেন, কিন্তু কারা কিভাবে আগুন দিল তা দেখেননি তারা।
নিহত সুমন শেখের ভাই উকিল শেখ বলেন, রিয়ার জানাযা শেষে ফেরার পথে ওই বাড়িতে কে বা কারা আগুন লাগিয়ে দেয়। এ সময় বাড়ির ভেতরে দেখতে গিয়েছিলেন এলাকারই পাঁচজন। সেখানেই গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়ে তারা দগ্ধ হন বলে শুনেছি। খবর পেয়ে গিয়ে দেখি আমার ভাইও আছে। কারা যে আগুন দিল, আর আমার ভাই সেখানে কেন গিয়েছিল বুঝতে পারছি না।
নিহত ইমন ওরফে সাপুর বড় ভাই ইমরান হোসেন বলেন, ইমন ফার্নিচারের কাজ করতো। রিয়ার জানাযা শেষে ফেরার পথে ওই বাড়িতে আগুন দেখতে পায় সবাই। এখন কিভাবে যে কি হলো কিছুই জানি না। একটা বিকট শব্দে বিস্ফোরণ হয়ে তারা ৫ জন দগ্ধ হয়। তার মধ্যে আমার ভাইকে দেখতে পাই। এখন তারা সেখানে দেখতে গিয়েছিল নাকি আগুন নেভাতে গিয়েছিল কিছুই জানি না।
নিহত সাব্বিরের চাচাতো ভাই শাকিল হোসেন বলেন, সাব্বির ও ইমন একসাথে ফার্নিচারের কাজ করতো। রিয়ার জানাযায় দুজন একসাথে যায়। শেষ করে ফেরার পথে তারা অভিযুক্ত নাইমের বাড়িতে দেখার জন্য যায় যে কোন ঘরে ঘটনাটা ঘটেছিল। আর আকাশে মেঘ উঠে আসায় আমি চলে আসি। বাড়িতে আসার কিছুক্ষণ পর শুনি আগুনে নাকি তারা পুড়ে গেছে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য বাদশা আলমগীর একই সুরে জানান, সবাই জানাযা শেষ করে ফেরার পথে ওই বাড়িতে আগুন দেখতে পায়। কিভাবে আগুন লাগলো, কারা দিল দেখিনি যেহেতু বলতে পারবো না। আর যারা মারা গেছে তারা ওই বাড়িতে কখন কিভাবে গেছে সেটাও জানা নাই। তবে ঘটনাটা খুব দু:খজনক।
এ বিষয়ে পাবনা সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) এ এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, আগুনে পুড়িয়ে মারার অভিযোগে হত্যা মামলা হয়েছে। নিহত সুমন শেখের ভাই উকিল শেখ বাদি হয়ে সোমবার অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে মামলা করেছেন।
থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মনিরুজ্জামান আরো জানান, অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা আগুন দিলে কন্টেইনার বা সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়ে তারা আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যায় এবং তাদের পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে, তদন্ত চলছে।
উল্লেখ, স্কুলছাত্রী রিয়া খাতুন ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় নিহতের ভাই খালিদ হাসান বাদি হয়ে ৪ জুন তিনজনকে আসামি করে সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পরে পুলিশ রিয়ার প্রেমিক নাইমসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, সদর উপজেলার ভাড়ারা ইউনিয়নের পূর্ব রাঘবপুর গ্রামের মৃত কাশেম প্রামানিকের ছেলে নাইম প্রামানিক (২২), একই এলাকার শফিক শেখের ছেলে ইয়াছিন শেখ (২১) ও শিমুল প্রামানিকের ছেলে তুহিন প্রামানিক (২০)। গ্রেপ্তারের পর তারা পুলিশের কাছে রিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করে।