সোমবার, জুন ২২, ২০২৬

কানসাট আমবাজারে অব্যাহত ‘ঢলন’ প্রথা, হতাশ চাষিরা

শিবগঞ্জ প্রতিনিধি ১৩ জুন ২০২৬ ১০:১৮ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
শিবগঞ্জ প্রতিনিধি ১৩ জুন ২০২৬ ১০:১৮ অপরাহ্ন
কানসাট আমবাজারে অব্যাহত ‘ঢলন’ প্রথা, হতাশ চাষিরা

রাজশাহী অঞ্চলের আম ব্যবসায় দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ‘ঢলন’ প্রথা বন্ধ করে কেজি দরে আম কেনাবেচার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমচাষিদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বিভাগীয় প্রশাসনের উদ্যোগে মঙ্গলবার (৯ জুন) বেলা ১১টায় রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ‘আমের বিপণন ও বাজারজাতকরণ সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সভায়’ সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট আমবাজারে মানা হচ্ছে না। এতে করে ‘ঢলন’ প্রথা অব্যাহত থাকায় হতাশ আমচাষিরা।


জানা গেছে, কানসাট আমবাজারে চাষিরা বাধ্য হয়ে মণ প্রতি ৫৫/৫৬ কেজি আম ওজন দিচ্ছে। ফলে আমের বাজার চাঙ্গা হলেও চাষিরা লাভবান হতে পারছে না। আমচাষিরা বলছেন, আমের ফলন ভাল হয়েও লাভ হচ্ছে না। কারণ, একদিকে দিন দিন আমের উৎপাদন খরচ বাড়ছে, বাড়ছে পরিবহন খরচ। সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কথিত আমচাষি ও আড়তদারদের সিন্ডিকেটের কারণে আমের ঢলনও দিন দিন বেশি হচ্ছে। 


চাষিদের ভাষ্যমতে, মাত্র এক যুগ আগেও আমের ঢলন ছিল মণ প্রতি ২/৩ কেজি। আর এখন দিতে হচ্ছে ১৫/১৬ কেজি। যা আগামী সপ্তাহে হয়তো ১৮ কেজি ঢলন ধরে ৫৮ কেজিতে একমণ হিসাবে ওজন দিতে হতে পারে। কারণ আড়ৎদার ও ফড়িয়া ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় বিভাগীয় প্রশাসন আমচাষী,আড়তদার ও আম ব্যবসায়ীদের নিয়ে সভার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত মোতাবেক  রাজশাহী বিভাগের কোন আমবাজারে মণ প্রতি ৪০ কেজির বেশি নিতে পারবে না। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হচ্ছে না। 


ভুক্তভোগী শাহাবাজপুর ইউনিয়নের কয়লা বাড়ি থেকে আসা আম বিক্রেতা মোস্তাফা জানান, অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথরের ন্যায় কানসাট আমবাজারে মণপ্রতি ৫৪/৫৬ কেজি আম দিতে বাধ্য হচ্ছি। কারণ যে সিন্ডিকেট কাজ করছে তাতে সবধরনের প্রশাসন এসেও এ প্রথা বাতিল করতে পারবে না। আমাদের লাভের মাথা এখানেও খাওয়া পড়ছে। তানোর থেকে আগত আম বিক্রেতা বলেন, কানসাট বাজারেরর ওজনের ক্ষেত্রে যা চলছে, তাতে মণে আমচাষিরা কলুর বলদে পরিণত হয়েছে। ৪০ কেজির স্থলে ৫২-৫৬ কেজি যা পৃথিবীর কোথাও নেই। একই কথা কানসাট আমবাজারে আম বিক্রি করতে আসা শত শত আমচাষির। তবে আড়ৎদারদের ভাষা ভিন্ন। তারা বলছেন, আমরা কোন আমচাষিদের বাধ্য করছি না। নিজে থেকেই ৫২-৫৬ কেজিতে মণ ধরে তাদের আম বিক্রি করছে। এটা আজ নতুন নয়। তাছাড়া আম একটি পচনশীল ফল। এর প্রসেসিং করতে করতেই মণ প্রতি ২/৩ কেজি আম নষ্ট হয়ে যায়। 


চলতি মৌসুমে কানসাট বাজার থেকে চারিদিকে ১৬ কিলোমিটার জুড়ে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম কানসাট আমবাজারে অধিক লাভের আশায় দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নওগাঁর সাপাহারসহ বিভিন্ন এলাকার আমও এখানে আসে। কিন্তু উৎপাদন পর্যায়ে বাড়তি খরচের সঙ্গে এখন ঢলন ও খাজনার বোঝা চেপে বসেছে চাষির ওপর। কানসাটের  আমচাষি মশাল চাঁন বলেন, এ বছর আমের ফলন ভালো হয়েছে। পাঁচ বছর ধরে ঢলন প্রথাসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে আমরা ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছি। এই লোকসান আমরা নিতে পারছি না।


কানসাটের আম বিক্রেতা রবিউল ইসলাম জানান, যতোবার আন্দোলন হচ্ছে ততোবার চাষিরা জিম্মি হচ্ছে। ১০ বছর আগে ৪২/৪৩ কেজিতে আম কেনা-বেচা হলেও গত কয়েক বছর থেকে বর্তমানে ৫৫/৫৬ কেজিতে মণ গিয়ে ঠেকেছে। 


আমের আড়ৎদার মেহেরুল ইসলাম জানান, ওজন জটিলতা নিয়ে প্রায় ১০ বছর ধরে প্রতিবারই ভরা মৌসুমে একটি গোষ্ঠি আন্দোলনের ফলে চার দফা উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে ৪০ কেজিতে মণ ধরে বা কেজি দরে আম কেনাবেচার কথা বলা হলেও কোনো ক্ষেত্রে চাষি আবার কোনো ক্ষেত্রে আড়ৎদারদের অীনহার কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি। এতে চাষি, ব্যবসায়ীসহ আম-সংশ্লিষ্টরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। 


কানসাট আম আড়ৎদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক টিপু জানান, আমের ভরা মৌসুমে একটি গোষ্ঠি আম কাঁচামাল হওয়ার পরও অযৌক্তিক ৪০ কেজিতে মণ ধরে আম কেনাবেচার আন্দোলনের গ্যাঁড়াকলে ফেলে আমবাজারের পরিবেশ অস্থিতিশীল করছে। তার দাবি চাষিদের সমঝোতার ভিত্তিতেই ঢলন প্রথার মাধ্যমে আম কেনা হচ্ছে। 


জেলার শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাজহারুল ইসলাম জানান, বিভাগীয় কমিশনারের নির্দেশনা মোতাবেক ৪০ কেজিতে মণ ধরে আম কেনাবেচার কথা আমরা আমচাষি, ব্যবসায়ী ও আড়ৎদারকে জানিয়েছি এবং বাজার পরিদর্শন করেছি।