সোমবার, জুন ২২, ২০২৬

হঠাৎ অটোরিকশার ভাড়া বৃদ্ধি

অতিরিক্ত ভাড়াই রাসিক’র না, চলছে তদারকি
নিজস্ব প্রতিবেদক ১৮ জুন ২০২৬ ১১:০৪ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ১৮ জুন ২০২৬ ১১:০৪ অপরাহ্ন
হঠাৎ অটোরিকশার ভাড়া বৃদ্ধি

নগরীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সর্বনিম্ন ভাড়া দ্বিগুণ হওয়ায় সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে চালক ও যাত্রীদের মধ্যে বচসা হচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে রাজশাহী সিটি করপোরেশন বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে তারা কোনো ভাড়া বৃদ্ধি করেনি। হঠাৎ করে সর্বনিম্ন ভাড়া ৫ টাকা থেকে ১০ টাকায় উন্নীত করাকে কেন্দ্র করে নগরের বিভিন্ন পয়েন্টে যাত্রী ও চালকদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক, উত্তেজনা ও বাগ্বিতণ্ডার ঘটনা ঘটছে।


ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার লাইসেন্স দিয়ে থাকে সিটি করপোরেশন। অথচ সিটি করপোরেশনকে উপেক্ষা করেই এক শ্রেণির অটো রিকসাচালক ভাড়া বৃদ্ধির রিফলেট বিতরণ করে অতিরিক্ত ভাড়া নিতে থাকে। হঠাৎ করেই মনগড়া ভাড়া বৃদ্ধির ফলে সাধারণ যাত্রীরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। এখন সড়কে অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে যাত্রী ও চালকগণ বিরোধে জড়িয়ে পড়ছে। বিষয়টি রাজশাহী সিটি করপোরেশনের নজরদারিতে এলে তারা তৎপর হয়ে ওঠে। রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন স্পষ্ট করে যে, অটোরিকশার ভাড়া বৃদ্ধি কিংবা নতুন করে কোনো ভাড়া নির্ধারণ করা হয়নি। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) প্রকাশিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে।


রাসিকের গণবিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, ‘সম্প্রতি নগরীতে চলাচলকারী কিছু অটোরিকশা চালক যাত্রীদের নিকট হতে নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে মর্মে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ প্রেক্ষিতে স্পষ্টভাবে জানানো যাচ্ছে যে, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন অটোরিকশার ভাড়া বৃদ্ধি কিংবা নতুন করে কোনো ভাড়া নির্ধারণ করেনি।


বিজ্ঞপ্তিতে নগরবাসীকে নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত ভাড়া প্রদান থেকে বিরত থাকার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় থেকে বিরত থাকার জন্য অটোরিকশা চালকদের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে


ভাড়া সংক্রান্ত বিষয়টি তদারকিতে মাঠে নেমেছে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব বিভাগ। বৃহস্পতিবার নগরীর বর্ণালী, লক্ষ্মীপুর মোড়সহ বিভিন্ন মোড়ে রাসিকের রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অটোরিকশা চালক ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক কোনো ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়নি বলে তাদের অবহিত করা হয় এবং এ বিষয়ে সকলের সহযোগিতা কামনা করা হয়।


এ সময় রাসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আবু সালেহ মো. নূর-ঈ-সাঈদ, রাজস্ব কর্মকর্তা সারোয়ার হোসেন খোকনসহ উপ-যানবাহন শাখার অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।


বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সকালে নগরীর সিএন্ডবি মোড়ে যাত্রী ও চালতের মধ্যে বাক-বিতণ্ডা লক্ষ্য করা যায়। একাধিক যাত্রী চালকের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়ে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় একই চিত্র লক্ষণীয়। স্বল্প দূরত্বের যাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করায় যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ আরো বাড়ছে। নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজের এক শিক্ষার্থী সোমিক শাহী রায়হান জানান, তিনি প্রতিদিন রেলগেট থেকে সিএন্ডবি মোড় হয়ে নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজে যান। আগে যেখানে ১০ টাকায় যাতায়াত করতেন, সেখানে বর্তমানে অতিরিক্ত ৫ টাকা জোর করে আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, “আমি ১০ টাকা ভাড়া দিয়েছি, কিন্তু চালক আরও ৫ টাকা জোর করে নিয়েছে। এটা অন্যায্য, এটা মেনে নেওয়া যায় না।”


অন্যদিকে ভাড়া বৃদ্ধির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন কিছু চালক। অটোরিকশাচালক রকি জানান, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। তাঁর দাবি, সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা এবং দূরত্বভেদে ১৫ টাকার ভাড়া ২০ টাকা করা হয়েছে। তিনি বলেন, “সব জিনিসের দাম বেড়েছে। গাড়ির খরচও বেড়েছে। তাই আমরা ভাড়া বাড়াতে বাধ্য হয়েছি।” তবে এ ভাড়া বৃদ্ধির কোনো সরকারি অনুমোদন নেই বলে জানিয়েছে সিটি করপোরেশন। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আবু সালেহ মো. নূর-ঈ সাইদ বলেন, ভাড়া বাড়ানোর বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি জানান, সিটি করপোরেশন থেকে পূর্বে গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ভাড়া নির্ধারণ করা হলেও নতুন কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। কে বা কারা এই ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দিয়েছে, তা কর্তৃপক্ষের জানা নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।


ভাড়া বাড়ানোর সূত্র খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, ৫ টাকার ভাড়ায় ক্রস চিহ্ন দিয়ে ১০ টাকা লেখা এবং ভাড়া বাড়ানোর কারণ ব্যাখ্যা দিয়ে লেখা একটি পোস্ট ফেসবুকে ভেসে বেড়াচ্ছে। এতে ৫ টাকার ভাড়া ১০ টাকা করার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে গাড়ির মূল্যবৃদ্ধি। দেখানো হয়েছে, আগে গাড়ির দাম ছিল ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা, এখন ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা। আগে ব্যাটারির দাম ছিল ৪৫ হাজার টাকা, এখন ৮০ হাজার। আগে টায়ার ছিল ৮৫০ টাকা, এখন ২ হাজার ৪০০। আগে চার্জার বিল ছিল ১০০ টাকা, এখন ২২০। আগে ব্রেক সু ছিল ১৬০ টাকা, এখন ৩৬০। রোড মামলা আগে ছিল ৩০০ টাকা এখন হয়েছে ২ হাজার ৬০০।


অটোরিকশার জিনিসপত্রের এই দাম ঠিক আছে কি না, তা যাচাই করার জন্য নগরের বড় অটোরিকশা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান নাহার অটোর ব্যবস্থাপক কাজী মো. তুহিনকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, এখন তো কোনো গাড়ির দাম বাড়েনি। বাজেটে আরও কমার কথা। তবে এক থেকে দেড় বছর আগে দাম বেড়েছে। বাড়লেও গাড়ির দাম ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা হয়নি। ২ লাখ ৬০ হাজার থেকে ২ লাখ ৬৫ হাজার হয়েছে। তা ছাড়া অন্যান্য যেসব আইটেমের দাম বাড়ানোর দাবি করা হয়েছে, সেগুলো আসলেই বেড়ে গেছে। তিনি বলেন, সব জিনিসের দামই বাড়ছে। সেখানে সর্বনিম্ন ভাড়া আর পাঁচ টাকা হতে পারে না। এটা ১০ টাকা হওয়াই যৌক্তিক।


এদিকে ভাড়া বৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন স্বল্প আয়ের যাত্রীরা। বেলদারপাড়া এলাকার স্কুলশিক্ষক রেজিনা খাতুন জানান, আগে যে রুটে ১৫ টাকায় যাতায়াত করতেন, এখন একই পথে যেতে ৩০ টাকা লাগছে। তাঁর মতে, “এটা সম্পূর্ণ অন্যায্য। একদিনে ভাড়া দ্বিগুণ হয়ে গেলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে যায়।”


অন্যদিকে, নগরের রাস্তায় অটোরিকশার সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যাত্রীদের অভিযোগ, প্রয়োজনের তুলনায় অটোরিকশার সংখ্যা অনেক বেড়ে যাওয়ায় রাস্তায় জট তৈরি হচ্ছে, কিন্তু ভাড়া কমানোর বদলে উল্টো বাড়ানো হয়েছে। স্থানীয় রিকশাচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, শহরে অটোরিকশার সংখ্যা এতো বেশি যে অনেক চালকের আয় কমে গেছে। তাঁর মতে, “আগে মানুষ পায়ে চালিত রিকশা চালাত, এখন সবাই অটোরিকশা চালায়। এতে প্রতিযোগিতা বেড়েছে, কিন্তু আয় কমে গেছে।” সব মিলিয়ে রাজশাহীতে অটোরিকশা ভাড়া বৃদ্ধিকে ঘিরে এক ধরনের অঘোষিত অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের সুস্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।