সোমবার, জুন ২২, ২০২৬

ভরা মৌসুমে বগুড়ায় বেড়েছে চালের দাম, নিম্নআয়ের মানুষে বিপাকে!

দীপক সরকার, বগুড়া ১৯ জুন ২০২৬ ১০:০৮ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
দীপক সরকার, বগুড়া ১৯ জুন ২০২৬ ১০:০৮ অপরাহ্ন
ভরা মৌসুমে বগুড়ায় বেড়েছে চালের দাম, নিম্নআয়ের মানুষে বিপাকে!

কর্মসংস্থানে বেতনে অসংগতি, শ্রম মজুরীও কম, ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে অনেকটাই নাজেহাল পরিস্থিতি স্বল্প ও নিম্ন আয়ের মানুষদের। খাদ্য চাহিদায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষপত্রের মূল্যের উর্দ্ধগতির সাথে নতুন করে যোগ চালের বাজারে অস্থিরতা। বোরো মৌসুমে(ভরা মৌসুম) সাধারণত চালের বাজারে স্বস্তি ফেরার কথা থাকলেও দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। ইদের পর সপ্তাহের ব্যবধানে ৫০ থেকে ২৫ কেজির প্রতি বস্তায় দাম বেড়েছে ১শো থেকে ২শো টাকা পর্যন্ত। পাইকারিতে বিভিন্ন জাতের চালের দাম কেজিপ্রতি ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এতে খুচরা পর্যায়ে কেজিপ্রতি চালের দাম বেড়েছে ৫ থেকে ৬ টাকা পর্যন্ত। চালের এই বাড়তি দামে চাপ তৈরি হয়েছে স্বল্প আয়ের মানুষগুলোর উপরে।


শুক্রবার (১৯ জুন) বগুড়া শহরের ফতেহ আলী বাজারসহ বেশকিছু বাজার ঘুরে দেখা যায়, বিআর-৪৯ চাল বর্তমানে দাম বেড়ে ৫৪ থেকে ৫৫ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে, যা এক সপ্তাহ আগেও ৫২ থেকে ৫৩ টাকায় বিক্রি হয়। রঞ্জিত চাল ৪৭ থেকে ৪৯ টাকা কেজি বিক্রি হলেও বর্তমানে কেজিতে ৩ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়ে ৫০ থেকে ৫২ টাকা কেজি, বিআর-২৮ চাল ৫৫ থেকে ৫৬ টাকা কেজিতে বিক্রি হলেও বর্তমানে তা দাম বেড়ে ৫৮ থেকে ৫৯ টাকা এবং মৌসুমের নতুন কাটারিভোগ চাল প্রতি কেজি মানভেদে ৭০ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।


ব্যবসায়ীদের দাবি, ইরি-বোরো মৌসুমের শেষদিকে বাজারে ধানের সরবরাহ কমে এসেছে। বর্তমানে যে ধান বাজারে পাওয়া যাচ্ছে, তার বড় অংশই মজুতকারীদের হাতে। ফলে ধানের দাম বেড়েছে। তবে চালের খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, মিল মালিক ও মজুদদাররা বরাবরেই মতোই সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়েছেন। আর মিল মালিকরা বলছেন, মজুদ কমে যাওয়া ও ধানের দাম বাড়ার কারণেই বাড়তি চালের দাম। তবে ক্ষুব্ধ মত ক্রেতাদের। তারা বলছেন, কৃষকের কাছে ধান নেই, মিল মালিকরা ধান মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে চালের বাজার অস্থির করে তুলেছেন।


অন্যদিকে ক্রেতাদের অভিযোগ, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সুযোগ বুঝে চালের দাম বাড়ানো হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতীয় চাল আসা কমে গেছে। এলসিও বন্ধের মতো পরিস্থিতি হয়েছে। ফলে বাজারে সরবরাহ কমে আসায় প্রভাব পড়ছে বাজারে। খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, ইদকে ঘিরে বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় তাদেরও বেশি দামে চাল কিনতে হচ্ছে।


চাল ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের দাবি, মূল্যবৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। ধানের উচ্চমূল্য, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, বিদ্যুতের বাড়তি খরচ এবং ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এসব অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রভাব শেষ পর্যন্ত চালের বাজারে পড়ছে।


জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চালের বাজার স্বাভাবিক রাখতে জেলায় ওএমএস (খোলা বাজারে খাদ্যশস্য বিক্রি) কর্মসূচি সচল রাখা হয়েছে। এছাড়া অবৈধ মজুত খুঁজে বের করতে জেলার বিভিন্ন মিল পরিদর্শন করা হচ্ছে।


বাজার ঘুরে দেখা যায়, বিআর-৪৯ চাল প্রতি ২৫ কেজির বস্তা কয়েক দিন আগে ১২শো থেকে ১২৮০ টাকা দাম পড়লেও বর্তমানে তার দাম পড়ছে ১৩শো থেকে ১৩৫০ টাকা, বিআর-২৮ (নতুন) চালের দাম বস্তা প্রতি ১৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে ১৪৫০ টাকা এবং কাটারিভোগ (নতুন) ১৭৫০ এবং পুরাতন চাল ১৮৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। বাজারে প্রতি কেজি আটাশ চাল ৫৫ থেকে ৫৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ছিল ৫৩ থেকে ৫৪ টাকা। মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৬ থেকে ৭০ টাকায়, আগে ছিল ৬৩ থেকে ৬৭ টাকা। নাজিরশাইল বিক্রি হচ্ছে ৭২ থেকে ৭৮ টাকায়, আগে ছিল ৬৮ থেকে ৭০ টাকা।


অনুসন্ধানে জানা যায়, উত্তরাঞ্চলের মধ্যে সবজি ও ধান-চাল উৎপাদনকারী জেলা বগুড়া। বোরো মৌসুম মাত্র শেষ হয়েছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর ফসল ভালো হয়েছে। তারপরও হঠাৎ চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রকারভেদে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি চালের দাম বেড়েছে ২ থেকে ৩ টাকা। আর খুচরা বাজারে বেড়েছে ৫ থকে ৬ টাকা। পাইকারিতে চালের দাম বাড়ায় স্থানীয় খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। বোরো মৌসুমে সাধারণত নতুন ধান বাজারে আসায় চালের দামে স্বস্তি ফেরার প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু ভরা মৌসুমেও জেলার চালের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।


এবার জেলায় অভ্যন্তরীণ বোরো সংগ্রহ ২০২৬ মৌসুমের আওতায় সররকারি প্রতি কেজি ধানের সংগ্রহ মূল্য ৩৬ টাকা, প্রতি কেজি সিদ্ধ চালের সংগ্রহ মূল্য ৪৯ টাকা, প্রতি কেজি আতপ চালের মূল্য ৪৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় ১৭ হাজার ৭৮১ মেট্রিক টন ধান, ৭২ হাজার ৬০২ মেট্রিক টন চাল এবং ৩ হাজার ৮১১ মেট্রিক টন আতপ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।


শহরের ফতেহ আলী বাজারের চাল ব্যবাসয়ী মিন্টু দাস বলেন, এসময়ে সাধারণত চালের দাম কমে। কিন্তু এবার উল্টো প্রতি বস্তায় ১শো থেকে ২শো টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। চালের দাম বাড়ার পিছেন ধানের দাম ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়াও কারণ হতে পারে।


শহরের কলোনী এলাকার চাল ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেন জানান, হঠাৎ পাইকারিতে কেজি প্রতি ২ থেকে ৩ টাকা চালের দাম বেড়েছে। বোরো মৌসুমের শেষদিকে বাজারে ধানের সরবরাহ কমে এসেছে। বর্তমানে যে ধান বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। তার বড় অংশই মজুতকারীদের নিয়ন্ত্রণে। ফলে ধানের দামও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।


এদিকে জেলার মিল মালিকরা জানান, ধানের মৌসুমে বগুড়ার মিলগুলো থেকে প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ হাজার মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হতো। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ থেকে ৪ হাজার মেট্রিক টনে। মিল মালিকদের দাবি, উৎপাদন ব্যয়ের বড় অংশই এখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নির্ভর। একটি অটোরাইস মিলে চাল উৎপাদনের মোট ব্যয়ের প্রায় ১৫ শতাংশই বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় হয়।


চালের বাজার নিয়ন্ত্রন নিয়ে জানতে চাইলে বগুড়া সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. হারুন-উর-রশিদ জানান, চালের বাজার স্বাভাবিক রাখতে জেলায় ১৭জন ডিলারের মাধ্যমে ওএমএস (খোলা বাজারে খাদ্যশস্য বিক্রি) কর্মসূচি সচল রাখা হয়েছে। তবে এ কর্মসূচী জেলার প্রত্যেক উপজেলা পর্যায়েও চালু রয়েছে। এছাড়া যদি কেউ অবৈধভাবে মজুদ করে থাকে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন ব্যবস্থা নেওয়া হবে দাবী করেন ওই কর্মকর্তা।