পশ্চিম রেলে ১১টি ট্রেন দেওয়া হবে ইজারা, ভাড়া বৃদ্ধির আশঙ্কা
বাংলাদেশ রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলে ১১টি ট্রেন দেওয়া হবে ইজারা। ট্রেনগুলো ইজারা দেওয়ার অনুমোদন চেয়ে রেল সদর দপ্তরে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। রাজস্ব ঘাটতির কারণে ১১টি মেইল ও লোকাল ট্রেন ইজারা দেওয়া হচ্ছে। এতে ট্রেনগুলো লাভজনক অবস্থানে আসবে বলেই ধারণা।
পশ্চিমাঞ্চল রেলের কর্মকর্তা কারণ হিসেবে বলছেন, ট্রেনগুলো চলাচল করায় প্রতিবছর মোটা অংকের লোকসান হচ্ছে। এতে রাজস্ব ঘাটতি হচ্ছে। রাজস্ব বাড়ানোর জন্য ১১টি মেইল ও লোকাল ট্রেন বেসরকারি অপারেটরদের কাছে হস্তান্তরের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে আশঙ্কা করা হচ্ছে, অপারেটরদের হাতে ট্রেন গেলে ভাড়া আরও বৃদ্ধি পাবে।
বেসরকারি সংস্থাগুলো ট্রেনের অভ্যন্তরীণ পরিষেবা পরিচালনা, টিকিট পরিদর্শন, পরিচ্ছন্নতা এবং যাত্রী কার্যক্রম তদারকির জন্য চুক্তিবদ্ধ করা হয়। বাংলাদেশ রেলওয়ে ট্র্যাক, ইঞ্জিন ও কোচের মালিকানা ধরে রাখে সংস্থাগুলো।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলে ছয়টি আন্তর্জাতিক ট্রেন, ৬২টি আন্তঃনগর ট্রেন, ৫৫টি মেইল ও কমিউটার ট্রেন এবং ১২টি লোকাল ট্রেন চলাচল করছে। এর মধ্যে বেসরকারি অপারেটরদের কাছে ২৪টি মেইল, কমিউটার ও লোকাল ট্রেন ইজারা দিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা আয় করছে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পশ্চিমাঞ্চল রেল বারবার তার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ৩ কোটি ৭৬ লাখ যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করেছে। এর বিপরীতে আয় করেছে ৬৪৯ কোটি টাকা। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ৭৭ কোটি টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ১৬০ কোটি টাকা। আয় হয়েছে ৬২১ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১০ মাসে (ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) ৮২৫ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। কিন্তু আয় হয়েছে ৫৬৬ কোটি টাকা।
রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, ১০ থেকে ১২টি ট্রেন ধারাবাহিকভাবে লাভজনক ছিল। এগুলো রাজশাহী-ঢাকা, ঢাকা-চাপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী-খুলনা এবং রাজশাহী-পার্বতীপুর রুটে চলাচল করে। কম ভাড়া, পরিচালন ব্যয় এবং টিকিটবিহীন ভ্রমণের কারণে বেশিরভাগ মেইল ও লোকাল ট্রেনগুলোতে লোকসান অব্যাহত আছে। অনেক যাত্রী স্থানীয় রুটে টিকিট ছাড়াই যাতায়াত করছেন। কাউন্টার থেকে টিকিট কেনার পরিবর্তে ট্রেনের কর্মীদের তারা টাকা দিচ্ছেন।
পশ্চিমাঞ্চল রেলের অতিরিক্ত প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক আনসার আলী বলেন, অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগের ফলে ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। আরও কর্মী নিয়োগ করা হলে, এই ট্রেনগুলো থেকে প্রাপ্ত আয়ের চেয়ে খরচ বেশি হলেও ইজারা দেওয়া বেশি লাভজনক।
তিনি বলেন, লোকাল ট্রেন থেকে কম আয়ের অন্যতম প্রধান কারণ যাত্রীদের টিকিট কিনতে অনীহা। এ কারণে আমরা ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছি।
প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক আহসান উল্লাহ ভূঁইয়া বলেন, রাজস্ব বৃদ্ধি এবং সেবার মানোন্নয়নের লক্ষ্যেই এই উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে। সব মেইল ও লোকাল ট্রেনে সঠিকভাবে টিকিট পরীক্ষা করার জন্য রেল কর্তৃপক্ষের পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে বিপুল রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। সব ট্রেনের আয়-ব্যয়ের হিসাব সম্মিলিতভাবে তৈরি করা হয়। প্রতিটি মেইল বা লোকাল ট্রেনের বছরে কত লোকসান হয়, তা দেখানোর জন্য কোনো পৃথক হিসাব নেই।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদ জানান, ১১টি মেইল ও লোকাল ট্রেন ইজারা দেওয়ার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। সদর দপ্তরের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এরপর প্রক্রিয়া করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ট্রেনগুলো ইজারা দেওয়া হবে। এই নীতি যাত্রীদের উপকারে আসবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের রাজশাহী জেলা শাখার সভাপতি আহমেদ শফি উদ্দিন। তিনি বলেন, যদি উদ্দেশ্য শুধু কয়েকজন ব্যবসায়ীর জন্য ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি করা হয়, তবে এই উদ্যোগটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। আমাদের দেশে বেসরকারিকরণের ফলে প্রায়শই সাধারণ মানুষের ব্যয় বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, বেসরকারি পরিচালনাকারীরা লাভজনকভাবে এই ট্রেনগুলো চালাতে পারে এবং তারপরও সরকারকে ইজারা ফি প্রদান করে। তাহলে স্বাভাবিক প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ রেলওয়ে নিজে কেন তা করতে পারে না।
শফি উদ্দিন বলেন, সরকার স্বাস্থ্যসেবা ও পরিষেবা খাতের মতো অত্যাবশ্যকীয় সেবাগুলোতে ভর্তুকি দেয়। রেল পরিবহনকেও একইভাবে দেখা উচিত। উন্নততর কর্মী ব্যবস্থাপনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জনবলের ঘাটতি মোকাবিলা করা উচিত। দুর্বল শাসন ও দুর্নীতি রেলওয়ের প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে রয়ে গেছে।