বুধবার, নভেম্বর ০৪, ২০২৬

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৪ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১৫০

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ২২ অক্টোবর ২০২৬ ১০:২৬ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ২২ অক্টোবর ২০২৬ ১০:২৬ অপরাহ্ন
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩৪ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১৫০

চাঁপাইনবাবগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি থামছে না। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৪ মাসে জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৫০ জন। এর মধ্যে ২০২৪ সালে ৮৮ জন, ২০২৫ সালে ৪০ জন এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে নিহত হয়েছেন ২২ জন। ফিটনেসবিহীন ও অনুমোদনহীন যানবাহনের চলাচল, বেপরোয়া গতি, অদক্ষ চালক এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করাকে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসে জেলার সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।


বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় ১৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মোটরসাইকেল আরোহী রয়েছেন। এবারের নিরাপদ সড়ক দিবসের প্রতিপাদ্য ‘নিরাপদ সড়ক সমৃদ্ধ দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। তবে ধারাবাহিক প্রাণহানির ঘটনা বলছে, সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজন এখনো রয়েছে।


জেলার অন্যতম দুর্ঘটনাপ্রবণ সড়ক চাঁপাইনবাবগঞ্জ-সোনামসজিদ মহাসড়ক। এ পথে ভারত থেকে আসা পণ্যবাহী ট্রাকের পাশাপাশি বাস, মাইক্রোবাস, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল চলাচল করে। একই সড়কে অটোরিকশা, ভটভটি ও নসিমনের মতো যানবাহনও চলাচল করছে। ভারী যানবাহনের চাপ, গতির প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন ধরনের যান একই সড়কে চলাচল করায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড বসানো হলেও দুর্ঘটনা বন্ধ হয়নি।


সড়কে ফিটনেসবিহীন যানবাহন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতি, ঝুঁকিপূর্ণভাবে অন্য যানবাহনকে অতিক্রম এবং মোটরসাইকেলে হেলমেট ব্যবহার না করার প্রবণতাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। গত ১৮ আগস্ট জেলায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় এক দিনেই পাঁচজন নিহত হন। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-সোনামসজিদ মহাসড়কে দুটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান চারজন। গত ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট-চৌডালা সড়কের পুসকুনি এলাকায় ভটভটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে গেলে বাবা-ছেলেসহ তিনজন নিহত হন। আহত হন আরও আটজন। তাঁরা নাচোলের সোনাইচণ্ডী হাটে গরু বিক্রি করে ওই ভটভটিতে বাড়ি ফিরছিলেন। এ ছাড়া ২১ অক্টোবর শিবগঞ্জে গরুবোঝাই একটি ভটভটি উল্টে দুজন গুরুতর আহত হন।


সড়ক দুর্ঘটনার আরেকটি বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে চালকদের প্রশিক্ষণের মান। বিআরটিএ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ছাড়া অন্য কোনো বেসরকারি ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের বৈধ অনুমোদন নেই। অথচ অভিযোগ রয়েছে, জেলায় অন্তত ৩০টি বেসরকারি ড্রাইভিং স্কুল কার্যক্রম চালাচ্ছে। প্রশিক্ষণসংক্রান্ত নীতিমালায় ব্যবহারিক শিক্ষার পাশাপাশি ট্রাফিক আইন, সড়কের চিহ্ন ও সংকেত এবং যানবাহনের কারিগরি বিষয় শেখানোর কথা থাকলেও কিছু প্রতিষ্ঠানে মাত্র সাত থেকে ১৫ দিনের মধ্যে প্রশিক্ষণ শেষ করার অভিযোগ উঠেছে।


চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার বাসিন্দা শফিফুল ইসলাম বলেন, ৩০ দিনের প্রশিক্ষণের কথা বলে তাঁকে ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু সাত থেকে ১০ দিন গাড়ি চালানো শেখানোর পরই কোর্স শেষ বলে জানানো হয়। তাঁর অভিযোগ, ট্রাফিক সংকেত ও আইন সম্পর্কে কোনো ক্লাস নেওয়া হয়নি। চাঁপাইনবাবগঞ্জ বিআরটিএর সহকারী পরিচালক প্রকৌশলী মো. শাহজামাল হক বলেন, টিটিসি ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ছাড়া জেলায় অন্য কোনো বেসরকারি ড্রাইভিং স্কুলের বৈধ অনুমোদন নেই। অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা কঠিন। এসব প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে। তিনি অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার আহ্বান জানান।


গ্রামীণ সড়কে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ব্যাটারিচালিত ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহন চালানোর প্রবণতাও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। পারিবারিক আর্থিক সংকটে কেউ কেউ অল্প বয়সেই উপার্জনের জন্য চালকের আসনে বসছে। আবার কিছু কিশোর পড়াশোনার পাশাপাশি কিংবা পড়াশোনা ছেড়ে যানবাহন চালাচ্ছে। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও ট্রাফিক আইন সম্পর্কে ধারণা না থাকায় তারা নিজেরা যেমন ঝুঁকিতে পড়ছে, তেমনি অন্যদের নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, অনেক শিক্ষার্থী নিয়ম না মেনে মোটরসাইকেল নিয়ে বিদ্যালয়ে আসে। তাদের মধ্যে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানো ও নিজেদের দক্ষতা প্রদর্শনের প্রবণতা দেখা যায়। নিষেধ করার পরও অনেকে সতর্ক হচ্ছে না।


চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সাবেক সভাপতি সাদ হোসেন মুজাহিদ বলেন, সড়ক পরিবহন আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন, চালকদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহনের চলাচল বন্ধ করা জরুরি। রহনপুর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ইনচার্জ মাহতাব উদ্দিন বলেন, অবৈধ যানবাহনের আধিক্য, অনিয়ন্ত্রিত গতি ও নিয়মিত তদারকির ঘাটতি সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।


চাঁপাইনবাবগঞ্জ সার্কেলের বিআরটিএর সহকারী পরিচালক মো. শাহজামান বলেন, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে চালক, গাড়ির মালিক ও পথচারী—সবার দায়িত্ব রয়েছে। সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশ কাজ করছে। সবাই ট্রাফিক আইন মেনে চললে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।


২০১৮ সালে প্রণীত সড়ক পরিবহন আইনে বৈধ চালকের লাইসেন্স, যানবাহনের ফিটনেস, নির্ধারিত গতিসীমা ও ট্রাফিক আইন মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৪ মাসে ১৫০ জনের প্রাণহানির তথ্য সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ তুলে ধরছে। অনুমোদনহীন ড্রাইভিং স্কুলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, অদক্ষ ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের নিয়ন্ত্রণ, ফিটনেসবিহীন যানবাহন অপসারণ এবং মহাসড়কে নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় নিরাপদ সড়কের প্রত্যাশা দিবসের প্রতিপাদ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।