রাজশাহীতে সিজারের পর রক্তপাত, প্রসূতির মৃত্যু
সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়। দ্বিতীয়দফা অস্ত্রোপচার করেও রক্তপাত বন্ধ করতে পারেননি চিকিৎসক। এর মধ্যে দেওয়া হয় রক্ত ও প্লাজমা। একপর্যায়ে প্রসূতির জরায়ু কেটে ফেলতে হয়। তবু শেষ রক্ষা হয়নি। সংকটাপন্ন অবস্থায় এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান জয়নব বানু (২৯)।
রাজশাহী নগরের লক্ষ্মীপুর এলাকার কেয়ার নার্সিং হোমে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর এ ঘটনা ঘটে। বুধবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। স্বজনদের অভিযোগ, চিকিৎসকের ভুল অস্ত্রোপচারের কারণে জয়নবের মৃত্যু হয়েছে।
জয়নবের বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার পাকড়ি দক্ষিণপাড়া গ্রামে। তাঁর স্বামীর নাম আশরাফুল ইসলাম। ছয় বছর আগে প্রথম সন্তানও সিজারের মাধ্যমে জন্ম দিয়েছিলেন জয়নব। দ্বিতীয় সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে আর বাড়ি ফেরা হলো না তাঁর।
আশরাফুল ইসলাম জানান, গত ২ নভেম্বর বেলা ১১টার দিকে স্ত্রীকে রাজশাহীর বেসরকারি কেয়ার নার্সিং হোমে ভর্তি করেন তিনি। ক্লিনিকটির পরিচালক চিকিৎসক শামীমা খাতুন তুলিকা ওই দিন বিকেল চারটার দিকে জয়নবকে অস্ত্রোপচারকক্ষে নেন। সিজারের মাধ্যমে কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। বিকেল পাঁচটার দিকে তাঁকে কক্ষ থেকে বের করা হয়। কিন্তু এরপর থেকেই অস্ত্রোপচারের স্থানে রক্তপাত শুরু হয়। কোনোভাবেই তা বন্ধ হচ্ছিল না। স্ত্রীর জন্য রক্তের ব্যবস্থা করেন আশরাফুল।
রক্ত দেওয়ার পরও পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় রাত সাড়ে ১০টার দিকে জয়নবকে আবার অস্ত্রোপচারকক্ষে নেওয়া হয়। দ্বিতীয় দফায় অস্ত্রোপচারের সময় তাঁকে ছয় ব্যাগ রক্ত ও দুই ব্যাগ প্লাজমা দেওয়া হয়। রাত ১১টার দিকে চিকিৎসক তুলিকা স্বজনদের জানান, রোগীকে বাঁচাতে হলে জরায়ু কেটে ফেলতে হবে। স্বজনেরা সম্মতি দিলে তাঁর জরায়ু অপসারণ করা হয়।
রাত আড়াইটার দিকে জয়নবকে অস্ত্রোপচারকক্ষ থেকে বের করা হয়। তখন চিকিৎসক জানান, তাঁকে দ্রুত আইসিইউতে নিতে হবে। কিন্তু কেয়ার নার্সিং হোমে আইসিইউ সুবিধা না থাকায় ওই রাতেই নগরের আরেকটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয় তাঁকে।
সেখানে চিকিৎসকেরা জানান, জয়নবের অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। বাঁচার সম্ভাবনাও কম। ওই হাসপাতালেও তাঁকে রক্ত ও প্লাজমা দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে ১২ ব্যাগ রক্ত ও ছয় ব্যাগ প্লাজমা দেওয়ার পরও অবস্থার উন্নতি হয়নি। পরে বুধবার তাঁকে রামেক হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে পোস্ট সার্জিক্যাল আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত দেড়টার দিকে মারা যান জয়নব।
রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শেখ শামীম আহমেদ বলেন, অস্ত্রোপচারের পর রক্তনালির ভেতরে ব্যাপকভাবে রক্ত জমাট বাঁধার জটিলতা তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে রক্তপাত বন্ধ হয় না। এ ধরনের রোগীকে বাঁচানো কঠিন। তবে জয়নবের ক্ষেত্রে কী জটিলতা হয়েছিল, তা অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসকই ভালো বলতে পারবেন। তাঁকে রামেক হাসপাতালে আনা হয়েছিল একেবারে শেষ মুহূর্তে।
জয়নবের স্বামী আশরাফুল ইসলামের অভিযোগ, চিকিৎসকের ভুল অস্ত্রোপচারের কারণেই তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু হয়েছে। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চিকিৎসক শামীমা খাতুন তুলিকার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। বৃহস্পতিবার সকালে কেয়ার নার্সিং হোমে গিয়েও তাঁর কক্ষ তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। ওই সময় ক্লিনিকটিতে কোনো রোগীকেও চিকিৎসাধীন দেখা যায়নি।
কেয়ার নার্সিং হোমের আরেক পরিচালক মো. কামরুজ্জামান বলেন, রোগীর মৃত্যুর কারণ চিকিৎসক তুলিকা বলতে পারবেন। তবে কথা বলার জন্য তাঁকে পাওয়া যাবে না।
তিনি জানান, জয়নবের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে স্বজনেরা চিৎকার-চেঁচামেচি করেন। এতে ক্লিনিকে ভর্তি অন্য রোগীরাও রামেক হাসপাতালে চলে যান। জয়নবের মৃত্যু একটি দুর্ঘটনা বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ কারণে স্বজনদের কাছ থেকে কোনো টাকা নেওয়া হয়নি বলেও দাবি করেন কামরুজ্জামান।
রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. এসআইএম রাজিউল করিম বলেন, ঘটনাটি তিনি আগে জানতেন না। বৃহস্পতিবার বিষয়টি শুনেছেন। এ ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া হবে। ভুল অস্ত্রোপচারের প্রমাণ পাওয়া গেলে ক্লিনিকটির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।