শুক্রবার, নভেম্বর ০৬, ২০২৬

ভালোবাসার শেষ চিঠি

তন্ময় নিসার ০৫ নভেম্বর ২০২৬ ১০:৫২ অপরাহ্ন পাণ্ডুলিপি
তন্ময় নিসার ০৫ নভেম্বর ২০২৬ ১০:৫২ অপরাহ্ন
ভালোবাসার শেষ চিঠি

ছোট্ট একটা ক্যাফে। প্রতিদিন বিকেলে সেখানে একা বসে থাকত মন। হাতে থাকত এক কাপ কফি, আর চোখ থাকত ক্যাফের দরজার দিকে। যেন কারও জন্য অপেক্ষা করছে। অথচ সেই মানুষটি আর কখনো আসবে না। মনের জীবনে একসময় একজন মায়া। মেয়েটি শুধু তার ভালোবাসা ছিল না, ছিল তার প্রতিদিনের অভ্যাস, বেঁচে থাকার স্বপ্ন আর ভবিষ্যতের সব পরিকল্পনা। তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে।


সেদিন মায়া একটা বই খুঁজছিল। অনেকক্ষণ খোঁজার পরও বইটি না পেয়ে বিরক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মন পাশ থেকে বইটি এগিয়ে দিয়ে বলেছিল, এই বইটাই খুঁজছেন? মায়া হেসে বলেছিল, —হ্যাঁ! ধন্যবাদ। আপনি কি এখানে নিয়মিত আসেন? -হ্যাঁ, তবে বই পড়ার চেয়ে মানুষ দেখতে বেশি ভালো লাগে। মায়া একটু হেসে বলেছিল, —তাহলে আজ থেকে বই পড়ার অভ্যাসটাও করে ফেলুন। সেই ছোট্ট কথোপকথন থেকেই শুরু হয়েছিল তাদের গল্প।


প্রথমে বন্ধুত্ব, তারপর প্রতিদিনের কথা বলা, একসঙ্গে চা খাওয়া, বৃষ্টিতে ভেজা আর অকারণে হাসাহাসি। কখন যে দুজন দুজনের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছিল, তারা নিজেরাও বুঝতে পারেনি।


মন ছিল একটু অভিমানী। আর মায়া ছিল ভীষণ চঞ্চল। মন মন খারাপ করলে মায়া তাকে হাসাত। মায়া কাঁদলে মন সারারাত জেগে তার কথা শুনত। একদিন বিকেলে নদীর পাড়ে বসে মায়া হঠাৎ জিজ্ঞেস করেছিল, —আচ্ছা মন, তুমি আমাকে কতটা ভালোবাসো? মন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেছিল, —যতটা ভালোবাসলে কাউকে হারানোর ভয় নিজের অস্তিত্ব হারানোর মতো মনে হয়। মায়া হেসে বলেছিল, —এত ভালোবাসো কেন?


মন উত্তর দিয়েছিল, —জানি না। তবে এটুকু জানি, তোমাকে ছাড়া আমার ভবিষ্যৎটা কল্পনা করতে পারি না। মায়া সেদিন মনের হাত ধরে বলেছিল, —তাহলে কথা দাও, কখনো ছেড়ে যাবে না।


মন বলেছিল, —মানুষ ছেড়ে যায় না, মায়া। পরিস্থিতি মানুষকে আলাদা করে দেয়। তবে আমি চেষ্টা করব, যেন কোনো পরিস্থিতিই আমাদের আলাদা করতে না পারে। কিন্তু মানুষ যা চায়, জীবন সব সময় তা দেয় না।


কয়েক মাস পর মায়ার পরিবার তার বিয়ের জন্য চাপ দিতে শুরু করল। পরিবারের পছন্দের ছেলেটি ছিল প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। মায়া অনেকবার বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে সে অন্য কাউকে ভালোবাসে। কিন্তু তার কথায় কেউ গুরুত্ব দেয়নি। অন্যদিকে মন তখনো নিজের ক্যারিয়ার গড়ার লড়াইয়ে ব্যস্ত। সে মায়াকে বিয়ে করতে চেয়েছিল, কিন্তু হাতে ছিল না পর্যাপ্ত অর্থ, ছিল না পরিবারের কাছে দাঁড়ানোর মতো অবস্থান।


একদিন মায়া ফোন করে বলল, —মন, আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। মন প্রথমে ভেবেছিল মায়া মজা করছে।

—আবার কী শুরু করলে? —সত্যি বলছি। আগামী মাসের বারো তারিখে বিয়ে।

কথাটা শুনে মনের পৃথিবী যেন থেমে গেল। সে অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল, —তুমি কি রাজি?


মায়া কাঁদতে কাঁদতে বলল, —আমার রাজি হওয়া বা না হওয়াতে কিছু যায় আসে না। বাবা অনেক অসুস্থ। মা বলেছে, আমি যদি এই বিয়েতে রাজি না হই, তাহলে তারা ভেঙে পড়বে।


মন নিজেকে সামলে বলল, —তাহলে আমার কী হবে, মায়া? মায়া কোনো উত্তর দিতে পারল না। শুধু ফোনের ওপাশ থেকে কান্নার শব্দ আসছিল। সেদিন রাতে দুজনেই অনেকক্ষণ ফোনে ছিল। কেউ কিছু বলছিল না। অথচ দুজনেরই মনে হচ্ছিল, হাজারটা কথা বলা বাকি রয়ে গেছে।


বিয়ের আগের দিন মায়া শেষবারের মতো মনের সঙ্গে দেখা করতে চাইল। তাদের দেখা হলো সেই পুরোনো ক্যাফেতে। মায়া এসে মনের সামনে বসল। দুজনেই চুপচাপ। যে দুজন একসময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলত, আজ তাদের মুখে কোনো কথা নেই। মন পকেট থেকে একটা ছোট্ট বাক্স বের করল। ভেতরে ছিল একটি রুপার আংটি।


—তোমাকে দেওয়ার জন্য কিনেছিলাম। ভেবেছিলাম একদিন নিজের হাতে পরিয়ে দেব। মায়া আংটিটা হাতে নিয়ে কাঁদতে শুরু করল। —আমাকে ক্ষমা করে দিও, মন।


মন মুচকি হেসে বলল, —ক্ষমা চেয়ো না। ভালোবাসাটা তো মিথ্যা ছিল না। শুধু ভাগ্যটা আমাদের পক্ষে ছিল না।


মায়া কাঁদতে কাঁদতে বলল, —তুমি কি আমাকে ভুলে যাবে?

মন জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, —মানুষ কি নিজের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলো ভুলতে পারে?


সেদিন মায়া চলে গেল। মন তাকে আটকায়নি। কারণ সে জানত, ভালোবাসা মানে শুধু কাউকে নিজের করে পাওয়া নয়, কখনো কখনো ভালোবাসার মানুষের অসহায়ত্বটুকুও বুঝতে হয়। তারপর কেটে গেল পাঁচটি বছর।


মন এখন একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। নিজের ছোট্ট একটা ফ্ল্যাট আছে। জীবনে সবকিছুই আছে, শুধু মায়া নেই।


মায়ারও সংসার হয়েছে। একটি ছোট্ট মেয়ে আছে তার। স্বামীকে নিয়ে সে ব্যস্ত জীবন কাটায়। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, সে খুব সুখি। একদিন হঠাৎ মনের ফোনে অপরিচিত নম্বর থেকে কল এল। —হ্যালো, মন?


কণ্ঠটা শুনেই মন চিনতে পারল। —মায়া? —কেমন আছো?

—ভালো আছি। তুমি? —আমিও ভালো। কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর মায়া বলল, —জানো, আজ তোমার কথা খুব মনে পড়ছিল। তাই ফোন করলাম। মন হেসে বলল, —পুরোনো মানুষদের কথা মাঝে মাঝে মনে পড়ে। এতে দোষের কিছু নেই।


মায়া একটু থেমে বলল, —তুমি কি এখনো সেই ক্যাফেতে যাও? মন অবাক হয়ে বলল,—হ্যাঁ, মাঝে মাঝে।

—আমাদের প্রথম দেখা হওয়ার দিনটার কথা মনে আছে? —প্রতিটা মুহূর্ত মনে আছে।

মায়া কাঁদতে কাঁদতে বলল, —মন, জীবনে সব পেয়েও কেন জানি মনে হয়, একটা জায়গা আজও খালি রয়ে গেছে।


মন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, —কিছু শূন্যতা পূরণ করার জন্য নয়, মায়া। কিছু শূন্যতা নিয়ে মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়।


ফোনটা কেটে গেল। মন আবার জানালার পাশে এসে দাঁড়াল। বাইরে তখন বৃষ্টি হচ্ছে। তার মনে পড়ল সেই প্রথম দিনের কথা, যেদিন মায়া বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল আর সে নিজের ছাতাটা এগিয়ে দিয়েছিল। আজও বৃষ্টি হয়। আজও মনের কাছে ছাতা আছে। শুধু ছাতার নিচে দাঁড়ানোর মানুষটি নেই। রাতের বেলা মন তার পুরোনো ডায়েরিটা খুলল। শেষ পাতায় লিখল— “মায়া, তোমাকে পাওয়ার জন্য একসময় পুরো পৃথিবীর সঙ্গে লড়তে চেয়েছিলাম। আজ আর কোনো অভিযোগ নেই। তুমি তোমার জীবনে ভালো থেকো। আমি আমার স্মৃতিগুলো নিয়ে বেঁচে থাকব। জানো, আমাদের গল্পের সবচেয়ে কষ্টের বিষয় বিচ্ছেদ নয়। কষ্টের বিষয় হলো, আমরা দুজনেই দুজনকে ভালোবেসেছিলাম, অথচ একসঙ্গে থাকতে পারিনি। তুমি হয়তো অন্য কারও জীবনের গল্প হয়ে গেছো। আর আমি আজও সেই গল্পের একটি অসমাপ্ত অধ্যায় হয়ে রয়ে গেছি। কিছু মানুষকে ভালোবাসা যায়, কিন্তু নিজের করে পাওয়া যায় না। আর কিছু গল্প শেষ হয়ে যাওয়ার পরও হৃদয়ের ভেতর প্রতিদিন নতুন করে শুরু হয়।


ইতি, তোমার একসময়ের মন।” ডায়েরিটা বন্ধ করে মন জানালার পাশে বসে রইল। বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে। কিন্তু তার ভেতরের বৃষ্টি আজও থামেনি।