রাকসু নির্বাচন : শান্তিপূর্ণভাবে শেষ ভোটগ্রহণ, অপেক্ষা ফলাফলের
পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, প্রায় ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী দিয়েছে ভোট

নিজস্ব ও রাবি প্রতিবেদক:
দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু), হল সংসদ ও সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকাল ৯টা থেকে শুরু হয়ে বিরতিহীনভাবে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চলে ভোটগ্রহণ। তবে ৪টার মধ্যে যারা ভোটকেন্দ্রের আঙিনায় প্রবেশ করেছিলেন, তারা ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। সব কেন্দ্রে একজন ভোটার গড়ে ১০ মিনিট সময়ের মধ্যে কোনো রকম বিঘœ ছাড়াই ভোট দিতে সক্ষম হয়েছেন।
নয়টি ভবনে স্থাপন করা ১৭টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। সকালের দিকে ভোটারের উপস্থিতি তুলনামূলক কম ছিল। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রগুলোতে বাড়ে ভোটারের উপস্থিতি। ভোট কেন্দ্রগুলোতে ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে পছন্দের প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন। ভোটগ্রহণকে কেন্দ্র করে কোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে ভোটগ্রহণ নিয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সমর্থিত প্রার্থীরা পৃথক সংবাদ সম্মেলনে পরস্পরকে অভিযোগ করেছেন।
রাকসু নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনের নিয়ে আসা হয়। সেখানে ভোটগণনার ব্যবস্থা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এছাড়া ভোটগণনা সরাসরি মিলনায়তনের বাইরে থেকে দেখতে পাবে ভোটা ও প্রার্থীরা। এই লক্ষ্য মিলনায়তনের সামনে বাশের ব্যরিক্যাড দেওয়া হয়েছে। সেখানে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দিনভর ভোট কেন্দ্রগুলোর দিতে চোখ থাকলেও এখন ভোট গণনার দিতে সবার চোখ। তবে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত ভোটগণনা শুরু করা হয়নি। কথা ছিল বিকেল পাঁচটা থেকে ভোটগণনা শুরু হবে।
সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিনোদপুর গেট, মেইন গেট ও কাজলা গেটে সতর্ক অবস্থানে দেখা গেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের। প্রত্যেকের পরিচয় শনাক্তের পরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে ক্যাম্পাসের ভেতরে। এমনভাবে দিনভর চলে চেকপোস্ট। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন মার্কেটে সবচেয়ে বেশি মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
এছাড়া ক্যাম্পাসের ভেতরে প্রার্থীদের বিভিন্ন কেন্দ্র পরিদর্শন করতে দেখা গেছে। এছাড়া প্রার্থীরা নিজেদের ভোট প্রয়োগ করেছেন। একই সঙ্গে প্রার্থীদের সমর্থকদের ভোটারদের ভোট প্রদানে জন্য বলা হয়। নিজের ভোট নিজে দেওয়া ছাড়াও প্রার্থী ও ভোটারদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠে ক্যাম্পাস। সবমিলে এক আনন্দঘন পরিবেশে নির্বাচনের ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়।
এদিন বিকেলেই কড়া নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে ব্যালট বাক্সগুলো কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনার মোস্তফা কামাল আকন্দ জানিয়েছেন, ভোট গণনা হচ্ছে ছয়টি অপটিক্যাল মার্ক রিকগনিশন (ওএমআর) মেশিনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি জায়গায় এলইডি স্ক্রিনে ফলগণনা সরাসরি দেখানো হচ্ছে। সবশেষে কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে সব কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণা করা হবে। ভোট গণনার পুরো প্রক্রিয়া সিসিটিভি ক্যামেরার আওতাভুক্ত থাকছে।
তিনি বলেছেন, ভোট গণনার সুবিধার্থে ১০০টি করে ব্যালট দিয়ে পৃথক বান্ডেল করা হবে। এ বান্ডেলের ভোট গোনা হবে ওএমআর মেশিনে, যা পর্যবেক্ষণ করবে বিশেষজ্ঞ প্যানেল। সব মিলিয়ে তিন ধাপে চূড়ান্ত ফল তৈরি হবে। একটি হলের ফল তৈরি শেষে আরেকটির গণনা শুরু হবে। তাতে ২৮৩টি পদের ফল জানাতে ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা সময় লেগে যেতে পারে।
এর আগে, সকাল সোয়া ৭টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী সরঞ্জামাদি বিতরণ শুরু হয়। এ সময় প্রিজাইডিং অফিসারদের কাছে হালনাগাদ ভোটার তালিকা, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স, ওএমআরযুক্ত ব্যালট পেপার, অমোচনীয় কালিসহ অন্যান্য নির্বাচনী সামগ্রী বিতরণ করা হয়।
এবারের রাকসু ভোটে আংশিক ও পূর্ণাঙ্গ মিলিয়ে অন্তত ১১টি প্যানেল অংশ নেয়। এর বাইরে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়েছেন প্রার্থীদের আরেকটি অংশ। ছাত্রদল, ছাত্রশিবির এবং স্বতন্ত্র কয়েকজন প্রার্থীরা এগিয়ে আছেন বলে জরিপ ও শিক্ষার্থীদের আলোচনায় উঠে এসেছে।
রাকসুর ২৩টি পদের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন ২৪৭ জন, যার মধ্যে নারী ২৬ জন। সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধির পাঁচটি পদে ৫৮ জন এবং হল সংসদের ১৫টি পদে ১৭টি হলে ৫৯৭ প্রার্থী লড়াই করছেন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের এই সংখ্যা রাকসু নির্বাচনের ইতিহাসে সর্বাধিক। এর মধ্যে ভিপি পদে ১৮, জিএস পদে ১৩ এবং এজিএস পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন ১৬ জন। বাকি ২০টি পদে ২০০ জন লড়াই করছেন। ৯টি ভবনে ১৭টি কেন্দ্রের ৯৯০টি বুথে প্রত্যেক ভোটারের রাকসু ও হল সংসদের মোট ৪৩টি পদে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।

নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৬৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ
রাকসু নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ২৮ হাজার ৯০১ জন। এর মধ্যে ছাত্রী ১১ হাজার ৩০৫ জন এবং ছাত্র ভোটার ১৭ হাজার ৫৯৬ জন। ভোট পড়েছে ২০ হাজার ১৮৭টি। শতকরা হার ৬৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ। সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি দেখা গেছে সৈয়দ আমির আলী হলে, যেখানে ভোট পড়েছে ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এর পরেই রয়েছে শাহমখদুম হলে ৭৭ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হলে ৭৭ দশমিক ৬০ শতাংশ ভোটার অংশগ্রহণ করেছেন। শহীদ শামসুজ্জোহা হল ৭৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ, বিজয়-২৪ হল ৭৪ দশমিক ৭১ শতাংশ, শেরে বাংলা ফজলুল হক হলে ৭৩ দশমিক ৯২ শতাংশ, মতিহার হল ৭৩ দশমিক ২২ শতাংশ, শহীদ হবিবুর রহমান হল ৭১ দশমিক ৫৫ শতাংশ, মাদার বখশ হল ৭১ দশমিক ২৫ শতাংশ, শহীদ জিয়াউর রহমান হল ৭০ দশমিক ৯৬ শতাংশ, নবাব আব্দুল লতিফ হল-৭০ দশমিক ১৩ শতাংশ। ছাত্রীদের হলের মধ্যে মুন্নুজান হলে ৬৭ দশমিক ১১ শতাংশ জুলাই-৩৬ হল ৬৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ, তাপসী রাবেয়া হলে ৬৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ বেগম খালেদা জিয়া ৬১ দশমিক ৪৫ শতাংশ, রহমতুন্নেসা হল ৬০ শতাংশ ৭০। অন্যদিকে সর্বনিম্ন ভোট পড়েছে রোকেয়া হলে, মাত্র ৫৯ দশমিক ৬০ শতাংশ। তবে ছাত্রীদের তুলনায় ছাত্র বেশি ভোটে অংশগ্রহণ করেছেন।
উঠে গেছে অমোচনীয় কালি
নির্বাচনে ব্যবহৃত অমোচনীয় কালি উঠে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করছেন প্রার্থীরা। প্রার্থীরা বলছেন, এতে জাল ভোট দেওয়া আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রাকসু নির্বাচনের বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে এই অভিযোগ পাওয়া গেছে। কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা ভোট দেওয়ার পর বাইরে এসে হাতে ঘষা দেওয়ার পরপরই ব্যবহৃত অমোচনীয় কালি উঠে যাচ্ছে।
ভোট প্রদান শেষ জুবায়ের নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন বলেছিল, তারা দেশের বাইরে থেকে কালি আমদানি করেছেন, যাতে তা উঠে না যায়। কিন্তু আমি ভোট দেওয়ার সাথে সাথেই উঠে গেল।’
আইনশৃঙ্খলা ও পরিবেশ পরিষদের সদস্য অধ্যাপক কাওছার আলী বলেন, ‘আমরা তা শোনার পর দায়িত্বরত পোলিং এজেন্টদের নির্দেশনা দিয়েছি, তারা যেন হাতের আঙুলে কালি ৫ সেকেন্ড ধরে রাখে। পাশাপাশি ভোটার বের হওয়ার আগে যেন আবার তা চেক করে।’
প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক সেতাউর রহমান বলেন, ‘আমরা দেশের বাজারের সর্বোচ্চ দামের কালির কলম কিনেছি। এরপরও যদি উঠে যায় তবুও সমস্যা হবে না। আমরা ভোট কেন্দ্রে ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা দেখে পরিচয় নিশ্চিত করে ভোট নিচ্ছি। নারী শিক্ষার্থীদের যারা নেকাব ব্যবহার করেন তাদের জন্যও আলাদা করে তাদের চেকিংয়ের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে আমাদের পক্ষ থেকে। আশা করছি, কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হবে না।’
ভোট কারচুপির অভিযোগ ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলের
নির্বাচনে ইসলামী ছাত্র শিবিরের বিরুদ্ধে ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলেছে ছাত্রদল সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্ম’ প্যানেল। বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন মার্কেটে সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে ‘ঐক্যবদ্ধ নতুন প্রজন্ম’ প্যানেল থেকে ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা শেখ নূর উদ্দিন আবীর বলেছেন, শহীদুল্লাহ্ একাডেমিক ভবনে প্রায় এক ঘণ্টা ভোট কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এতে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। পরে ভিতরে গিয়ে আমরা ১০০ ব্যালট পেপার স্বাক্ষর করা দেখতে পাই।
তিনি বলেন, সকালে ভোটের পরিবেশ সুষ্ঠু ছিল। কিন্তু, পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে বহিরাগতদের আনাগোনা বাড়তে থাকে। শিবিরের প্যানেলের জার্সি পরে অনেকে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেন। এমনকি, এই বহিরাগত ক্যাডার বাহিনী অনেক অস্ত্র মজুত রেখেছে।
এর আগে সকালে তিনি পোলিং এজেন্টদের ভোটার তালিকা দেখতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ করেছিলেন। তিনি বলেন, কথা ছিল প্রত্যেক প্রার্থীর এজেন্টরা ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা দেখতে পারবেন। কিন্তু আমাদের পোলিং এজেন্টদের ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা দেখতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। তারা কিন্তু চাইলেই দেখতে পারছেন না। বিষয়টি আমি প্রধান নির্বাচন কমিশনার স্যারকে জানালাম। দ্রুত সময়ের মধ্যে তিনি সমস্যার সমাধান করতে চাইলেন।
অভিযোগের পাহাড় ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলের
নির্বাচনে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল। ভোটগ্রহণ চলাকালে বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর) দুপুর ২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাশে সংবাদ সম্মেলন করে এই অভিযোগ জানানো হয়।
অভিযোগগুলো পড়ে শোনান শিবির সমর্থিত সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট প্যানেলের জিএস প্রার্থী ফাহিম রেজা। তিনি বলেন, ভোট গ্রহণের সময় ভোটারদের হাতে দেওয়া অমোচনীয় কালি মুছে যাচ্ছে, নির্বাচন কমিশন অনুমতি দিলেও সিরাজী ভবন, রবীন্দ্র ভবন ও জগদীশ চন্দ্র বসু ভবনের ভোটকেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের চিরকুট নিয়ে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, ছাত্রদল ও আধিপাত্যবিরোধো প্যানেলের প্রার্থীরা আচরণবিধি লঙ্ঘন করে ভোটকেন্দ্রের ১০০ গজের মধ্যে প্রচারণা চালাচ্ছে। খালেদা জিয়া ও হবিবুর রহমান হলের পাশে ছাত্রদল বুথ নির্মাণ করেছে, যা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করে না।
ফাহিম অভিযোগ করেন, ক্যাম্পাসে এখন বহিরাগত প্রবেশ করছে। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কড়াকড়ি শিথিল করেছে। নীতিমালা লঙ্ঘন করে গত রাতে ক্যাম্পাসে দেয়াল লিখন করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
ফাহিমের অভিযোগ, ছাত্রশিবির মনোনীত প্যানেল ও জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। জামায়াত নাকি অস্ত্রের রাজনীতি করছে এমনটি বলা হচ্ছে। ছাত্রদলের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক ক্যাম্পাসে বসে থেকে এসব গুজব ছড়াচ্ছেন। ছাত্রদলের সভাপতি নিজেও ফেসবুকে এ সংক্রান্ত একটি পোস্ট দিয়েছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে জানানো হয়েছে। কমিশন দ্রুত ব্যবস্থা নেবে বলে আশা করছি।

প্যানেলের ভিপি প্রার্থী মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, এই নির্বাচন নিরপেক্ষ হয়েছে কি না সেটি ফলাফলের পর বলা যাবে। আমরা নির্বাচন কমিশনকে বাধ্য করব সুষ্ঠুভাবে ফলাফল ঘোষণা করার জন্য।
অসংগতি পেয়েছে বামধারার গণতান্ত্রিক শিক্ষার্থী পর্ষদ
নির্বাচনের কিছু অসংগতি তুলে ধরেছে বামধারার গণতান্ত্রিক শিক্ষার্থী পর্ষদ প্যানেল। বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন মার্কেটে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অসংগতি তুলে ধরেন প্যানেলের সহসভাপতি (ভিপি) প্রার্থী ফুয়াদ রাতুল।
ফুয়াদ রাতুল বলেন, রাকসু নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হলেও শুরু থেকেই আমরা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ঘাটতি দেখতে পেয়েছি। কিছু প্যানেল সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিতের শর্তকে লঙ্ঘন করে মাত্রাতিরিক্ত অর্থ খরচ করেছে। উপহার বিলি, ভূরিভোজ আয়োজন, শিক্ষার্থীদের প্রাইভেসি লঙ্ঘনের মতো ঘটনার বিরুদ্ধে প্রশানের উদ্যোগ আমরা দেখতে পাইনি।
ফুয়াদ আরও বলেন, শহীদুল্লাহ হলের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা ভোটকেন্দ্রের ভেতর শিবিরের প্যানেলের প্রচার চালিয়েছেন বলে আমরা অভিযোগ পেয়েছি। কিছু হলের প্রার্থীরা একের অধিক ব্যালট প্রাপ্তির কথা জানিয়েছে। বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ইচ্ছাকৃত লাইন জ্যামিংয়ের ঘটনা আমরা দেখেছি। এ ছাড়া রাকসুতে অংশগ্রহণ করা দুটি প্যালেনের দলীয় নেতা-কর্মীরা কাজলা ও বিনোদপুর গেটে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের জমায়েত ঘটিয়েছে, যা ক্যাম্পাসে একধরনের ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
নিষিদ্ধ স্থানেই জমায়েত বিএনপি ও জামায়াতের
নির্বাচন উপলক্ষে ক্যাম্পাসের চারপাশে ২০০ গজের মধ্যে সকল প্রকার সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে পুলিশ। তবে এই নিষিদ্ধ স্থানেই জমায়েত হয়েছেন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীরা। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে তাদের জমায়েত চললেও পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো বাধা দেওয়া হয়নি।
ভোটগ্রহণ চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিনোদপুর ফটকের পূর্ব পাশে জমায়েত হয়েছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। ক্যাম্পাসের সীমানাপ্রাচীরের পাশে কয়েক ফুটের একটি ফুটপাত, এরপর সড়ক। এই সড়কে লম্বা শামিয়ানা টানিয়ে সমবেত হয়েছেন বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল এবং সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা।
এ স্থানটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার ১০ গজের কম দূরত্বে। দুপুরে সেখানে মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি আবুল কালাম আজাদ সুইট বসে থাকতে দেখা যায়।
কিছুটা পশ্চিম দিকে সড়কের উল্টো পাশে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের জমায়েত হতে দেখা যায়। তারাও সেখানে শামিয়ানা টানিয়ে প্যান্ডেল করেছেন। ক্যাম্পাসের উত্তর প্রান্তে স্টেশন বাজার। স্টেশন বাজারের পাশ দিয়ে গেছে রেললাইন। রেললাইনের ওপারেও বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীদের জমায়েত হতে দেখা যায়। একই অবস্থা দেখা গেছে বিশ^বিদ্যালয়ের প্রধান ফটক থেকে শুরু করে তালাইমারী মোড় পর্যন্ত।
এই নির্বাচন উপলক্ষে একটি নির্দেশনা জারি করেছে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ। সেখানে বলা হয়েছে, রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ আইন, ১৯৯২-এর ২৬-এর ১(ঢ); ২৯-এর (১)(ক), (খ) ও ৩০ ধারায় অর্পিত ক্ষমতাবলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচনের এক দিন আগে থেকে নির্বাচনের পরের দিন, অর্থাৎ ১৫ অক্টোবর রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে ১৭ অক্টোবর রাত ১২টা পর্যন্ত মোট তিন দিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে ও তৎসংলগ্ন এলাকার চতুর্দিকে ২০০ গজের মধ্যে সকল প্রকার মিছিল, মিটিং, সমাবেশ, বিক্ষোভ প্রদর্শন, মাইকিং, আতশবাজি, পটকা ফুটানোসহ অন্যান্য ক্ষতিকারক দ্রব্য ব্যবহার, অস্ত্রশস্ত্র, তলোয়ার, বর্শা, বন্দুক, ছোরা বা লাঠি, বিস্ফোরক দ্রব্য বহন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীদের জমায়েতের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান বলেন, ‘এ রকম জমায়েত করার কোনো সুযোগ নেই। আমরা বিজ্ঞপ্তি জারি করে এটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছি।’ তবে নিষিদ্ধ এলাকায় জমায়েতের ব্যাপারে পুলিশকে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি।
ভোটার আসার আগেই স্বাক্ষরিত শতাধিক ব্যালট
ভোটার আসার আগেই প্রায় শতাধিক ব্যালট পেপারে স্বাক্ষর করেছেন এক সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা। এতে ওই কেন্দ্রের পোলিং এজেন্টরা দাবি করেন ভোটে কারচুপি করার জন্যই এ স্বাক্ষর করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুর ৩টার দিকে শহীদুল্লাহ একাডেমিক ভবনের ১৫০ গ্যালারিতে শহিদ জিয়াউর রহমান হল কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটেছে। অভিযুক্ত কর্মকর্তা হলেন সহকারি প্রিজাইডিং অফিসার অধ্যাপক মশিউর রহমান।
ভোট কেন্দ্রটিতে দেখা যায়, কেন্দ্রের দায়িত্বরত সহকারি প্রিজাইডিং কর্মকর্তা ভোটার আসার আগেই শতাধিক ব্যালট পেপার স্বাক্ষর করে রেখেছেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, কেন্দ্র্রে ভোটারের ভিড় বেশি থাকায় তিনি আগে থেকে স্বাক্ষর করে রেখেছেন। কোনো কারচুপির সুযোগ নেই।
ওই কেন্দ্রে দায়িত্বরত পোলিং এজেন্ট মহিউদ্দিন আহমেদ সীমান্ত বলেন, কেন্দ্রে হঠাৎ আমি দেখতে পাই, স্যার তার কাছে গেলেই তিনি পেপার দিয়ে দেন। আমি এগিয়ে গিয়ে দেখি তিনি ভোটার আসার আগেই শতাধিক পেপার স্বাক্ষর করে রেখেছেন। তিনি তার পছন্দের ভোটার আসলেই একের অধিক ব্যালট পেপার দেবেন এই উদ্দেশ্যে তিনি এটি করেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্রর দায়িত্বরত প্রিজাইডিং কর্মকর্তা অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান অভিযোগ স্বীকার করে বলেন, কেন্দ্রে এ ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছে। কর্মকর্তার এই কাজটি ঠিক হয়নি।
ব্যবস্থাপনায় কিছু ত্রুটি পেয়েছে পর্যবেক্ষণ কমিটি
নির্বাচন আয়োজনে ছোট-খাটো ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলেও ভোট গ্রহণে কোনো অসঙ্গতি ছিল না বলে জানিয়েছে পর্যবেক্ষক দল। বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর) সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই কথা জানান পর্যবেক্ষক কমিটির সভাপতি ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এম রফিকুল ইসলাম।
রাকসু, হল সংসদ ও সিনেট ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনের সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য ৯ সদস্যের এই কমিটি গঠন করেছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক এম রফিকুল ইসলাম বলেন, সার্বিকভাবে নির্বাচনী ব্যবস্থা ও ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে। এটি একটি যুগান্তকারী নির্বাচন। ভোট কেন্দ্রে স্থান সংকুলানসহ কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল, তবে ভোট গ্রহণে কোনো অসঙ্গতি চোখে পড়েনি।
ভোট কেন্দ্রে একটি প্যানেলের লিফলেট পাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একটি ভোট কেন্দ্রে এটি হয়েছে। ওই হলের প্রোভোস্ট আমাদের অবহিত করেছেন। এছাড়া আর কোনো কেন্দ্রে এমন ঘটনা ঘটেনি।
একটি কেন্দ্রে এক ঘণ্টা ভোট গ্রহণ বন্ধ থাকার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা এমন কোনো অভিযোগ পাইনি। আমরা প্রতিটি কেন্দ্রে পোলিং এজেন্টদের সঙ্গে কথা বলেছি। কেউ আমাদের কাছে অভিযোগ করেনি।
ইচ্ছাকৃতভাবে লাইন জ্যাম করে রাখার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, কিছু হলের ভোটার সংখ্যা বেশি হওয়ায় এবং কেন্দ্রে জায়গা কম থাকায় দীর্ঘ লাইন হয়েছিল। তবে এটি ইচ্ছাকৃত নয়।
ফল তৈরি হবে তিন ধাপে
নির্বাচন কমিশনার মোস্তফা কামাল আকন্দ জানিয়েছেন, নয়টি ভবনে ভোট গ্রহণ শেষে সব ব্যালট বাক্স নেওয়া হয়েছে কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে। ভোট গণনার সুবিধার্থে ১০০টি করে ব্যালট দিয়ে পৃথক বান্ডেল করা হবে। এ বান্ডেলের ভোট গোনা হবে ওএমআর মেশিনে যা পর্যবেক্ষণ করবে বিশেষজ্ঞ প্যানেল। সবমিলিয়ে তিন ধাপে চূড়ান্ত ফল তৈরি হবে। একটি হলের ফল তৈরি শেষে আরেকটির গণনা শুরু হবে। তাতে ২৮৩টি পদের ফল জানাতে ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা সময় লেগে যেতে পারে।