ঢাবির কেন্দ্রীয় মাঠে ছাত্রীদের ‘প্রবেশ নিষিদ্ধের’ সিদ্ধান্ত কে দিলো?
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কেন্দ্রীয় মাঠে সন্ধ্যার পর নারী শিক্ষার্থীদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে নানান তর্ক-বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। নারী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ঢাবির কেন্দ্রীয় মাঠে সন্ধ্যার পরে প্রবেশ করতে চাইলে গেটম্যানরা তাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কথা জানিয়ে বাধা দেয়। এ নিয়ে তারা শিক্ষার্থী সংসদেও অভিযোগ জানিয়েছেন। তবে কোনও সুরাহা হয়নি।
তবে ঢাবি প্রশাসন ও ডাকসু উভয়পক্ষই বলছে, নারী শিক্ষার্থীদের সন্ধ্যার পর মাঠে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। আগের নিয়মেই সব আছে। গেটম্যানরা হয়ত ব্যক্তিগত বা ‘মুরুব্বিয়ানার’ মনোভাব থেকে এমন আচরণ করছেন, এমন ভাষ্যও এসেছে তাদের পক্ষ থেকে।
কেন্দ্রীয় মাঠে প্রবেশে বাধার অভিযোগ তুলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের মনোবিজ্ঞান বিভাগ শিক্ষার্থী ফারেহা তুল ফারাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমি কেন্দ্রীয় মাঠে হাঁটতে গেলে, আমাকে মাঠে প্রবেশ করতে না দিয়ে গেটম্যান জানান, ৫টার পর নারী শিক্ষার্থীদের প্রবেশ নিষেধ। এই নিয়ম ডাকসু এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন সম্মিলিতভাবে নিয়েছে। আমি জানতে চেয়েছিলাম, ঠিক কী কারণে ৫টার পর মেয়েরা থাকতে পারবেনা? কিন্তু কোনও সদুত্তর মেলেনি।”
তিনি বলেন, “আমি ছাড়াও ক্যাম্পাসের আরও কয়েকজন নারী শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে নারী শিক্ষার্থীদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ীও, গেটম্যানরা এই বাধার কারণ হিসেবে প্রশাসনের নির্দেশনার কথা উল্লেখ করেছেন।”
তিনি আরও বলেন, “বাস্তবতা হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠের গেটে বিকাল পাঁচটার পর সত্যিই নারী শিক্ষার্থীদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে একাধিক শিক্ষার্থী ইতোমধ্যে শিক্ষার্থী সংসদেও জানিয়েছে।”
ঢাবির এই শিক্ষার্থী আরও বলেন, “এই পরিস্থিতিতে ডাকসু ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব হলো দ্রুত একটি সুস্পষ্ট, লিখিত এবং সর্বজনের জন্য প্রযোজ্য নির্দেশনা জারি করা। গেটম্যান বা মাঠ সংশ্লিষ্ট কর্মচারীরা যেন নিজেদের মতো করে নিয়ম প্রয়োগ না করেন এবং প্রশাসনের নাম ব্যবহার করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করেন, এটি নিশ্চিত করা জরুরি।”
ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে এই শিক্ষার্থী বলেন, “আপনি সম্পাদকমণ্ডলীকে নিয়ে বসুন, প্রয়োজনে গঠনমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করুন, যাতে ছাত্র প্রতিনিধিরা শিক্ষার্থীদের সমস্যাকে দায়িত্বশীলভাবে সমাধান করতে সক্ষম হন।
একইসঙ্গে সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিদ্যমান গোঁড়ামি ও নারীবিদ্বেষী মনোভাব থেকে বের করে আনার উদ্যোগ নেওয়া অত্যাবশ্যক। নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে এভাবে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য ও ব্যক্তিগত আক্রমণ চলতে থাকলে, তার সামাজিক প্রতিক্রিয়া একসময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে, তখন পরবর্তীতে দায় এড়িয়ে যাওয়ার ঘোষণায় পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন হবে না।”
বিষয়টি নিয়ে ঢাবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী তানজির হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “গেটম্যানরা মাঝেমধ্যে ভিসি প্রক্টরদের চেয়ে বেশি ক্ষমতা দেখান। এ কারণে মাঝেমধ্যে অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। এক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ডাকসুর উচিত গেটম্যানদের এ বিষয়ে সতর্ক করে দেওয়া। তাছাড়া নারী শিক্ষার্থীদের বিষয়ে যদি কোনও বাধ্যবাধকতা বা নিষেধাজ্ঞা থেকে থাকে তাহলে তা বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করা। তাহলে সবার জন্য সুবিধা হয়।”
সন্ধ্যার পর নারী শিক্ষার্থীদের মাঠে প্রবেশের বিষয়ে ডাকসুর কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য হেমা চাকমা বলেন, “কথিত এই ‘কারফিউর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় মাঠে প্রতীকী কর্মসূচি— খেলাধুলা বা গান-বাজনা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে, যা রাত ১০টা বা ১১টা পর্যন্ত চলতে পারে। এছাড়াও সন্ধ্যার পর নারী শিক্ষার্থীরা কী করতে পারবেন বা পারবেন না—এ বিষয়ে প্রশাসনের কাছ থেকে লিখিত ব্যাখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করা হবে।”
গেটম্যানদের বাধা সংক্রান্ত বিষয়ে একজন সহকারী প্রক্টরের সঙ্গে কথোপকথন উল্লেখ করে হেমা চাকমা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “ডাকসু থেকে এই ধরনের কোনও বাধা নেই। তবে গেটম্যানরা প্রশাসনের বিভিন্ন সূত্র থেকে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পেয়েছে— আমি বললে একরকম, ভিপি বললে অন্যরকম, জিএস বললে আরেকরকম, সম্পাদকরা বললে আলাদা। আমার ধারণা, এখানে মূল সমস্যা হলো কেউ স্পষ্ট স্টেটমেন্ট না দেওয়ায় কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “আজ আমি আর তন্নি আপু (ডাকসুর গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক) এই বিষয় নিয়ে কথা বলার জন্য গিয়েছিলাম। সেখানে আমার মনে হলো, তারা হয়ত যথাযথভাবে কোনো স্টেটমেন্ট দেবে না। এজন্য আমি ১৬ জানুয়ারি একটি প্রোগ্রামের আয়োজন করেছি। ওই অনুষ্ঠানের সময় তারা যদি স্টেটমেন্ট দিতে পারে, ভালো হবে, তবে আমার ধারণা তারা তা সহজে দেবে না।”
এদিকে, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ ও জিমনেসিয়ামে বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থী ও পুরুষ শিক্ষার্থীদের প্রবেশ নিয়ে নতুন কোনও নিয়ম ডাকসু কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে চালু করা হয়নি বলে জানিয়েছেন ডাকসু’র ক্রীড়া সম্পাদক আরমান হোসেন। ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি জানান, আগে যেই নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা খেলার মাঠ ও জিমনেসিয়ামে প্রবেশ করতো, এখনও ঠিক সেভাবেই পারে। খেলাধুলা ও শরীরচর্চা করার জন্য শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠ ও জিমনেসিয়াম আগের নিয়মেই ব্যবহার করতে পারছে এবং পারবে।
তথ্যসূত্র: বাংলাট্রিবিউন