সোমবার, জুন ২২, ২০২৬

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৭ মাসে ৫৫ খুন

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:১৭ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:১৭ অপরাহ্ন
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৭ মাসে ৫৫ খুন

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় গত ১৭ মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জেলাজুড়ে ৫৫ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। রাজনৈতিক পট পরিবর্তন পরবর্তী আধিপত্য বিস্তার, জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ, মাদক ও পারিবারিক কলহের পাশাপাশি বেড়েছে গণপিটুনির মতো ঘটনা।

 

জেলা পুলিশের দেয়া তথ্য মতে, এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৪৯টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা, মাদকের সহজলভ্যতা এবং তুচ্ছ ঘটনায় আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতাই এই অস্থিরতার মূল কারণ। বিশেষ করে এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তার ও জমির বিরোধ নিয়ে সংঘর্ষ থামানো যাচ্ছে না।


গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণে করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট ভোলাহাটে ডাকাত সন্দেহে সানোয়ার নামে এক যুবককে গণপিটুনি দিয়ে হত্যার মধ্যদিয়ে এই অস্থিরতা শুরু হয়। একই দিন নাচোলে ইসমাইল হোসেন নামে এক স্কুলছাত্রের লাশ উদ্ধার করা হয়, যাকে প্রতিপক্ষের লোকজন পূর্ব শত্রুতার জেরে হত্যা করেছে বলে ধারণা পুলিশের।


এরপর ১০ আগস্ট শিবগঞ্জে রায়হান আলী নামে এক যুবককে গলা কেটে হত্যা করা হয়, যার নেপথ্যে মোটরসাইকেল ছিনতাই ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ ছিল। ২৭ আগস্ট একই উপজেলায় নবম শ্রেণির ছাত্র আব্দুল করিমকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। ৪ সেপ্টেম্বর পাওনা টাকা চাইতে গিয়ে মঈনুদ্দিন নামে এক ব্যক্তির লাঠির আঘাতে প্রাণ হারান রাজমিস্ত্রি বাদল আলী।


সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ভোলাহাটে পারিবারিক কলহ থামাতে গিয়ে ভাতিজার ছুরিকাঘাতে চাচা ইসমাইল হোসেন নিহত হন। ১০ অক্টোবর সদর উপজেলায় মাদকাসক্ত মিজানুর রহমান মিজু এক ইমামের ওপর হামলা চালালে স্থানীয়রা তাকে গণপিটুনি দেয়, এতে তার মৃত্যু হয়। ৩০ অক্টোবর ভোলাহাটে আবারও গণপিটুনির ঘটনা ঘটে। যেখানে ‘ডাকাত’ সন্দেহে জাহাঙ্গীর ও ইয়াকুব আলী নামে দুই ভাই প্রাণ হারান।


নভেম্বরের মাঝামাঝি শিবগঞ্জে মানসিক ভারসাম্যহীন জামাতার শাবলের আঘাতে নিহত হন শাশুড়ি সাকিনা বেগম। ২০ নভেম্বর গোমস্তাপুরে খাস জমি দখল নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে আব্দুস সাত্তার ও তোফাজ্জল হোসেন নামে দুজন নিহত হন এবং আরও ১৪ জন আহত হন। ২০২৪ সালের শেষ দিকে ১৮ ডিসেম্বর নাচোলে কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে মাসুদ ও রায়হান নামের দুই কিশোর প্রাণ হারায়।


২০২৫ সালের শুরুতেই ৩১ জানুয়ারি নাচোলে খাস জমি দখল নিয়ে সংঘর্ষে তরিকুল ইসলাম বকুল নামে এক ব্যক্তি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ৯ জুন জেলার গোমস্তাপুরে শিশুদের ক্রিকেট খেলা নিয়ে দ্বন্দ্বে বাশেদ আলী বিশু নামে এক বৃদ্ধ নিহত হন। জুন মাসেই ঈদুল আজহার ছুটিতে শিবগঞ্জে ঘাস কাটা ও জমির বিরোধে মাসুদ রানা, রফিকুল ইসলাম ও নজরুল ইসলামসহ ৩ জন নিহত হন। ২৩ জুন নাচোলে রাজু আহমেদ নামে এক ভ্যানচালকের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ, যাকে ভ্যান ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।


৫ জুলাই জমি নিয়ে বিরোধে নিজ ভাইদের হাতে খুন হন শুকরানি বেগম। ৯ জুলাই মাদকাসক্ত ছেলের মারধরের প্রতিশোধ নিতে পরিবারের হাতেই প্রাণ হারান মাহাবুবুল ইসলাম বাবু। ১৮ আগস্ট গোমস্তাপুরের এক আমবাগান থেকে অজ্ঞাতনামা এক নারীর জবাই করা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ২২ আগস্ট নাচোলে মাদকাসক্ত স্বামীর নির্যাতনে মারা যান আঁখি রাণী। ১৫ অক্টোবর নাচোলে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মিলন ও আলম নামের দুই ভাই। বছরের শেষে ৮ ডিসেম্বর সদর উপজেলার ইসলামপুরে চুরির অভিযোগে গণপিটুনিতে মোশারফ হোসেন নামের এক যুবক নিহত হন।


স্থানীয় আইনজীবী মো.হামিদুল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। হত্যাকাণ্ডের কারণ চিহ্নিত করে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।


তিনি অভিযোগ করেন, কিছু মামলায় চার্জশিট দাখিলে বিলম্বের কারণে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হচ্ছে। গণপিটুনির বিষয়ে তিনি বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এমনকি অপরাধী হলেও তাকে হত্যা করা দণ্ডনীয় অপরাধ।


চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, ৫৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ৪৯টি মামলা হয়েছে। অধিকাংশ অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। কয়েকটি মামলার চার্জশিটও দাখিল করা হয়েছে।


তিনি জানান, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশি তৎপরতা আরও জোরদার করা হয়েছে।


ক্রমবর্ধমান হত্যাকাণ্ড কি সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি, নাকি প্রশাসনিক দুর্বলতার ফল, এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।#