সোমবার, জুন ২২, ২০২৬

রক্তদহ বিল পুনঃখননে প্রতিবছর অতিরিক্ত উৎপাদন হবে ১৭০ কোটি টাকা মূল্যের ফসল

আব্দুর রউফ রিপন, নওগাঁ প্রতিনিধি: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:০৫ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
আব্দুর রউফ রিপন, নওগাঁ প্রতিনিধি: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:০৫ অপরাহ্ন
রক্তদহ বিল পুনঃখননে প্রতিবছর অতিরিক্ত উৎপাদন হবে ১৭০ কোটি টাকা মূল্যের ফসল

নওগাঁর রাণীনগর ও বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার ২২০ হেক্টর জমি নিয়ে অবস্থিত রক্তদহ বিল। এই বিলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ২৩টি গ্রাম। যে গ্রামগুলোর মানুষ বছরের পর বছর এই বিলকে ঘিরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। কিন্তু বিলটি পুনঃখনন না করার কারণে বছরের অধিকাংশ সময়ই জলাবদ্ধতায় আবদ্ধ থাকছে। যার ফলে কমেছে ফসলের উৎপাদন। কমেছে প্রাকৃতিক উপায়ে বড় হওয়া মাছের পরিমাণ। 


জলাবদ্ধতার কারণে বর্তমানে বিলের জমিতে বছরে মাত্র একটি ফসল উৎপাদন হচ্ছে। যদি বিলটি পুনঃখনন করা হয় তাহলে শত বছরের ঐতিহ্য রক্তদহ বিল থেকে প্রতিবছর ১৭০ কোটি টাকা মূল্যের অতিরিক্ত ফসল উৎপাদনের আশা করছে নওগাঁ বরেন্দ্র বহুমুখি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। অপরদিকে, বিলটি পুনঃখননে বিলে যেমন নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে তেমনই প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরবে আমূল পরিবর্তন। তাই জীবিকার মান উন্নয়নে ও স্থানীয় অর্থনৈতিক চাকাকে আরো গতিশীল করতে এবং আগামীর টেকসই ও নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনির্মাণে ঐতিহ্যবাহী রক্তদহ বিলকে পুনঃখননের কোন বিকল্প নেই বলে মনে করছে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবিদরা। 


ইতোমধ্যে রাণীনগর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রক্তদহ বিলের আউটলেট রতনডারা খালের উপর গড়ে তোলা হয়েছে পাখিপল্লী ও মৎস্য অভয়াশ্রম। যে পর্যটন এলাকায় এসে প্রতিদিনই শত শত পর্যটক প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রকৃতির সান্নিধ্যে এসে পাখি পল্লীর সৌন্দর্য্য উপভোগ করছেন। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পাখি পল্লীর সঙ্গে রক্তদহ বিলের জলকেলি উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকদের আগমন ঘটছে।


যদি রক্তদহ বিলটি পুনঃখনন করা যায় তাহলে অত্র অঞ্চলের দৃশ্যপট পাল্টে যাবে। রক্তদহ বিলকে ঘিরে পর্যটনের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। এছাড়া পাখি পল্লীর সার্বিক উন্নয়নে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে- যার অধিকাংশ পদক্ষেপ বাস্তবায়নের কাজও চলমান রয়েছে বলে জানান রাণীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাকিবুল হাসান। 


নওগাঁ বরেন্দ্র বহুমুখি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, নওগাঁ জেলার রাণীনগর উপজেলা (আংশিক) ও বগুড়া জেলার আদমদীঘি উপজেলা (আংশিক) অংশের ২২০ হেক্টর জমি নিয়ে গড়ে উঠেছে রক্তদহ বিল। বিলে ইনলেট খালের সংখ্যা ২২টি যার দৈর্ঘ্য ১৮৫ কিলোমিটার আর আউটলেট খালের দৈর্ঘ্য ২২কিলোমিটার। জলাবদ্ধতার কারণে প্রতিবছর ৪৫০০ হেক্টর জমিতে মাত্র এক ফসল উৎপাদন হয় যার ফলে বছরের পর বছর ২৩ টি গ্রামের ৭ হাজার কৃষক পরিবারের ৩৫ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বিলটি পুনঃখনন না করার কারণে প্রতিবছর ১৭০ কোটি টাকা মূল্যের ফসল উৎপাদন করা থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছে স্থানীয় কৃষকরা। 


বিলকৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা সাইদুর রহমান, মুকুল হোসেনসহ অনেকেই জানান রক্তদহ বিল হচ্ছে দুটি উপজেলার সম্পদ কিন্তু দীর্ঘদিন যাবত এই সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ না করার কারণে সরকার এই সম্পদ থেকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। যদি বিলটি পুনঃখনন করা হয় তাহলে বিলের জমিতে বছরে তিনটি ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এছাড়া ফসলের পাশাপাশি মাছেরও উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। ফলে বিলের চারপাশের হাজার হাজার কৃষক ও মৎস্যজীবীর জীবনচিত্র পাল্টে যাবে। পাল্টে যাবে এই অঞ্চলের দৃশ্যপট। তাই দেশের খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিলটি পুনঃখননের কোন বিকল্প নেই।


নওগাঁ বরেন্দ্র বহুমুখি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রেজাউল ইসলাম বিল পুনঃখননের সুফল সম্পর্কে জানান যে, বর্তমানে জলাবদ্ধতার কারণে বিল এলাকায় বছরে একটি মাত্র ফসল উৎপন্ন হচ্ছে। বিল ও এর আশেপাশের খাল পুনঃখনন করা হলে জলাবদ্ধতা দূর হয়ে বছরে তিনটি ফসল উৎপন্ন করা সম্ভব।


খননে প্রতি হেক্টরে ১২ মেট্টিক টন হিসাবে বছরে অতিরিক্ত ৫৪ হাজার মেট্টিকটন খাদ্যশস্য উৎপাদিত হবে যার বাজার মূল্য প্রায় ১৭০ কোটি টাকা। খননকৃত বিল ও খালের মাটি দ্বারা ১০ ফুট চওড়া পাকা গ্রামীণ সড়ক নির্মাণ করা সম্ভব হবে এবং খাল ও বিলের পাড়ে নির্মিত রাস্তার ভাঙ্গন রক্ষার্থে প্রয়োজনীয় রিটেইনিং ওয়াল/কংক্রিট ব্লক দ্বারা বাঁধাই/প্যালাসাইডিং নির্মাণ করা সম্ভব হবে।


এতে প্রত্যন্ত অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন হবে। পুনঃখননের প্রকল্প সঠিক ভাবে বাস্তবায়িত করা গেলে এলাকায় বিশাল জলাধারের সৃষ্টি হবে- যার ফলে প্রচুর মৎস্য উৎপাদন ও হাঁস পালন হবে যা দেশের মাছ, মাংস ও ডিমের চাহিদা পূরণসহ স্থানীয় জনগনের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। পরিবেশের উন্নতির জন্য নির্মিত গ্রামীণ সড়ক, খাল ও বিলের পাড়ে ফলজ, বনজ এবং ঔষধি গাছ রোপন করা সম্ভব। বড় জলাধার ও বৃক্ষরোপনের কারণে পাখির নিরাপদ অভয়াশ্রম গড়ে তোলা সম্ভব। 


তিনি আরো জানান, বিল পুনঃখননের পর বিলের চারিদিকে বিভিন্ন প্রকারের পরিবেশবান্ধব বৃক্ষরোপন করাসহ শিশুদের বিনোদনের জন্য বিভিন্ন স্থানে দোলনা, স্লিপার, ব্যালেন্সার ইত্যাদি স্থাপন করা হলে এলাকাটি স্থানীয় জনসাধারণের জন্য একটি বিশুদ্ধ ও সুস্থ বিনোদনের কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।


যদি বিলটি পুনঃখনন ও এতে সংরক্ষিত ভূ-উপরিস্থ পানি সেচকাজে ব্যবহারের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার  যেমন হ্রাস পাবে তেমনি ভাবে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরও বৃদ্ধি পাবে। দেশের এমন জাতীয় সম্পদকে সঠিক ও টেকসই ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে বিল পুনঃখননের জন্য ইতোমধ্যে একটি প্রকল্প উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষ বরাবর প্রেরণ করা হয়েছে। তাই দেশের অর্থনৈতিক চাকাকে আরো চাঙ্গা করতে ও স্থানীয়দের জীবনমানকে পাল্টে দিতে বিলটি পুনঃখননের কোন বিকল্প নেই বলে তিনি মনে করেন।