চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাণিজ্যিক মাল্টা চাষে সাফল্য
চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি মানেই আম, এই দীর্ঘদিনের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছেন নাচোল উপজেলার এলাইপুর গ্রামের কৃষক রুবেল। প্রচলিত ধান ও মৌসুমি ফসলের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি হাত দেন মাল্টা চাষে। শুরুতে অবিশ্বাস, ঝুঁকি আর সংশয়ের মুখে পড়লেও পরিকল্পিত উদ্যোগ, আধুনিক কৃষি জ্ঞান এবং অদম্য পরিশ্রমে আজ তিনি গড়েছেন সফল এক মাল্টা বাগান, যা শুধু তার জীবনের গল্পই বদলায়নি, বদলে দিচ্ছে এলাকার কৃষির দৃষ্টিভঙ্গিও।
কয়েক বছর আগেও রুবেল ছিলেন একজন সাধারণ কৃষক। ধান ও মৌসুমি ফসল চাষ করে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো। উৎপাদন খরচের তুলনায় লাভ কম থাকায় ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছিল। ঠিক তখনই গণমাধ্যম ও কৃষি বিষয়ক বিভিন্ন উৎস থেকে মাল্টা চাষের সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে পারেন তিনি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরীক্ষামূলকভাবে মাল্টা চাষে সাফল্যের খবর তাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
অনেকেই তাকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন- ‘এই এলাকায় মাল্টা হবে না’। কিন্তু রুবেল পিছিয়ে যাননি। উপজেলা কৃষি অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ নেন। উন্নত জাতের মাল্টা চারা সংগ্রহ করেন, জমি প্রস্তুত করেন বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে। নির্দিষ্ট দূরত্বে চারা রোপণ, নিয়মিত সেচ, জৈব সার ব্যবহার, মালচিং এবং রোগবালাই দমনে আধুনিক কৌশল অনুসরণ করেন।
নাচোল উপজেলার এলাইপুর গ্রামে রুবেলের প্রায় ৪০ বিঘা জমিতে এখন চোখ জুড়ানো মাল্টা বাগান। প্রতিটি গাছে ঝুলছে বড় আকারের, রসালো মাল্টা। প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ফলনে তিনি যেমন নিজে বিস্মিত, তেমনি অবাক স্থানীয় কৃষকরাও। স্থানীয় বাজারে মাল্টার চাহিদা ও দাম ভালো থাকায় উৎপাদন খরচ বাদ দিয়েও উল্লেখযোগ্য মুনাফা করছেন তিনি।
রুবেলের মাল্টা বাগান শুধু ব্যক্তিগত লাভের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পরিচর্যা, সংগ্রহ ও বিপণনে স্থানীয় কয়েকজন শ্রমিকের নিয়মিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। ফলে এলাকার অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
কৃষি উদ্যোক্তা রুবেল বলেন, অনেকে বলেছিল এই এলাকায় মাল্টা হবে না। কিন্তু আমি কৃষি অফিসের পরামর্শ মেনে নিয়মিত পরিচর্যা করেছি। শুরুতে ঝুঁকি ছিল, কিন্তু এখন খরচ উঠিয়ে লাভ হচ্ছে। আমার এই সাফল্য দেখে অন্য কৃষকরা যদি উৎসাহ পান, সেটাই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন।
স্থানীয় কৃষক এনামুল হক বলেন, রুবেলের বাগান দেখে আমরা সাহস পেয়েছি। আগে ভাবতাম এখানে মাল্টা চাষ সম্ভব না। কিন্তু নিজের চোখে ফলন দেখে এখন আমরাও আগ্রহী।
রুবেলের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে আশপাশের গ্রামের অনেক কৃষক ইতোমধ্যে মাল্টা চাষ সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছেন। কেউ ছোট পরিসরে বাগান করার পরিকল্পনা করছেন, কেউ কৃষি অফিসে যোগাযোগ শুরু করেছেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. ইয়াছিন আলী বলেন, মাল্টা একটি সম্ভাবনাময় ও লাভজনক ফল ফসল। চাঁপাইনবাবগঞ্জের মাটি ও জলবায়ু মাল্টা চাষের জন্য উপযোগী। রুবেল সঠিক চারা নির্বাচন, নিয়মিত পরিচর্যা ও রোগবালাই দমনে সচেতন থাকায় ভালো ফলন পেয়েছেন। পরিকল্পিতভাবে এই চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকরা বড় সাফল্য পেতে পারেন।
উল্লেখ্য সব মিলিয়ে বলা যায় , সঠিক পরিকল্পনা, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও অদম্য পরিশ্রমে রুবেল শুধু নিজের জীবনের গল্পই বদলাননি, চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষিতে সম্ভাবনার নতুন দিগন্তও উন্মোচন করেছেন।