মাদকের করাল গ্রাস
প্রয়োজন ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন ও জনসচেতনতা
মাদক একটি মরণনেশা ও মারাত্মক বৈশ্বিক সমস্যা। এই জনস্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। উন্নত-অনুন্নত কিংবা উন্নয়নশীল কোনো দেশই এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। এর অবৈধ পাচার, নানা অপরাধ বৃদ্ধি ও তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নষ্ট করার ক্ষেত্রে পালন করছে ন্যক্কারজনক ভূমিকা। কিন্তু মাদকের ভয়াবহতা মোকাবিলায় যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার, সামাজিক সচেতনতা এবং জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দরকার। তা বিশ্বে দেখা যায় না।
বাংলাদেশের পুলিশ প্রশাসনের মতে, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও খুনসহ রাজধানীতে সংঘটিত অধিকাংশ অপরাধের সহিত রয়েছে মাদকাসক্তির সম্পর্ক। আশঙ্কার বিষয় হলো, বাংলাদেশ মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হয়েও মাদকাসক্তির জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। যে সকল দেশে মাদক উৎপাদিত হয়। সেই সকল দেশের চক্রের মধ্যে বাংলাদেশ অবস্থিত। মাদক ব্যবসার প্রভাব বাংলাদেশকেও প্রভাবিত করে। এজন্য আমাদের যতটা সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার ছিল, তা আমরা কর্তব্যনিষ্ঠার পরিচয় দিতে পারিনি।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশে মাদকাসক্ত ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৮২ লক্ষ। শঙ্কার বিষয় হলো, এই বিশাল জনগোষ্ঠীর এক বৃহৎ অংশই তরুণ এবং তাদের অধিকাংশই আঠারো বছর বয়স পূর্ণ হবার পূর্বেই এই সর্বনাশা পথে পা বাড়াছে। এই তথ্য কেবল একটি সংখ্যা নয়, জাতির মেরুদণ্ড বলে পরিচিত যুবসমাজের অবক্ষয়ের এক মর্মান্তিক চিত্র। এতে প্রমাণিত হয় যে, মাদকাসক্তির ধরন যেমন বেড়েছে। তেমনি আজ শহর-গ্রাম-সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। যা একটি সুন্দর ও শান্তিময় সমাজব্যবস্থার অন্তরায় এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।
অধিকাংশ মাদকাসক্ত ব্যক্তি গুরুতর মানসিক ও শারীরিক ব্যাধিতে আক্রান্ত। তাদের এক বিশাল অংশ সুচিকিৎসা কিংবা পুনর্বাসন সেবা হতে বঞ্চিত। যথাযথ চিকিৎসার অভাব ও সামাজিক পুনরন্তর্ভুক্তির সুযোগ না থাকায় মাদক ছেড়ে দেয়ার পর পুনরায় লিপ্ত হচ্ছে। মাদক সমস্যাকে কেবল দণ্ডবিধির আয়নায় না দেখে একটি জনস্বাস্থ্য বিষয়ক বড় সংকট হিসাবে বিবেচনা করা অত্যাবশ্যক। সরকারকে মাদক চোরাচালান রোধে যেমন কঠোর হবে, তেমনই কিশোর ও তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি অধিক যত্নশীল হতে হবে। কেবল আইন দিয়ে এই ব্যাধি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন এবং ব্যাপক জনসচেতনতা।