সোমবার, জুন ২২, ২০২৬

তেল সংকট: সবজি পরিবহনে স্থবিরতা

নিজস্ব প্রতিবেদক ১২ এপ্রিল ২০২৬ ১১:১০ অপরাহ্ন কৃষি
নিজস্ব প্রতিবেদক ১২ এপ্রিল ২০২৬ ১১:১০ অপরাহ্ন
তেল সংকট: সবজি পরিবহনে স্থবিরতা
রাজশাহীর নওহাটা পেঁয়াজ বস্তায় নেওয়া হচ্ছে। নিয়ে যাওয়া হবে ঢাকাতে। তবে ট্রাক না থাকায় বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ী

দেশের অন্যতম খাদ্যশস্য উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত উত্তরাঞ্চল। এ অঞ্চলে আবাদ হয় ধান, গম, ভুট্টা, পেঁয়াজ, আলুসহ বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি। এছাড়া স্বাদু পানির মাছ, মুরগি, গবাদিপশুর বহু খামার রয়েছে। তবে তেলের সংকট হওয়ায় উৎপাদিত সবজি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এতে লোকশান দেখছেন ব্যবসায়ী ও চাষিরা।  


এসব কৃষি ও আমদানি পণ্য পরিবহনে সব মিলিয়ে এ অঞ্চলে চলাচল করে ১০ হাজারেরও বেশি ট্রাক-পিকআপ, যা টিকিয়ে রেখেছে শতকোটি টাকার বাণিজ্য। এ বাণিজ্যেও এখন লোকসান দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।


বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সামারি ক্রপ স্ট্যাটিসটিকস ২০২৪-২৫ ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় ধান ১ কোটি ৪৫ লাখ থেকে ১ কোটি ৫৫ লাখ টন, গম সাড়ে চার থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ, ভুট্টা ৪৫-৫০ লাখ, আলু ৭৫-৮০ লাখ, পেঁয়াজ ১৪-১৬ লাখ, মরিচ পাঁচ-ছয় লাখ, শাকসবজি ৫০-৫৫ লাখ এবং অন্যান্য ফসল ২৫-৩০ লাখ টন উৎপাদন হয়। 


এছাড়া গবাদিপশু খাতের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ সালে ২২ লাখ ৭৭ হাজার গরু, ভেড়া, মহিষ ও ছাগল উৎপাদন হয়েছে এবং এসব প্রাণী থেকে সাড়ে তিন লাখ টন দুধ উৎপন্ন হয়; যা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের চাহিদা মেটায়।


অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গ বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম মাছ উৎপাদন অঞ্চল বলে বিবেচিত। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার টন মাছ উৎপাদন হয়েছে। এ অঞ্চলে স্বাদু পানিতে পুকুরভিত্তিক চাষ হয়। জাতীয় উৎপাদনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ উত্তর জনপদেরই মাছ।


রাজশাহী কৃষি বিপণন অধিদফতরের সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা সানোয়ার হোসেন বলেন, জ্বালানি ঘাটতির কারণে মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের। প্রতিদিন কয়েক লাখ থেকে কোটি টাকার লোকসান হচ্ছে সবার। 


পুঠিয়ার ঝলমলিয়া, পবার খড়খড়িহাটসহ রাজশাহীর বিভিন্ন জায়গার একাধিক আড়তদাররা জানান, ট্রাক-লরি ও অন্যান্য পরিবহন সময়মতো না পাওয়ায় কাঁচামাল সংগ্রহ ও সরবরাহে তারা বেশ বিপাকে রয়েছেন। এতে তারা মাঠপর্যায়ে পেঁয়াজ, আলু, মরিচ ও অন্যান্য ফল-ফসলের দাম পাচ্ছেন না। 


এদিকে উৎপাদিত দুধ, ডিমসহ মাংসের জন্য প্রস্তুত প্রাণী স্থানান্তর করতে পারছেন না খামারিরা। এমন ঘটনা ঘটতে থাকলে উত্তরাঞ্চলের জেলা শহরগুলোতে হয়তোবা দাম কম থাকবে; কিন্তু ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের মতো বিভাগীয় শহরে কাঁচামালের দাম বহুগুণ বাড়বে। আবার উত্তরের কোল্ডস্টোরেজগুলোতে এত চাপ নেয়ার মতো সক্ষমতাও নেই যে সংরক্ষণ করা যাবে। সব মিলিয়ে ভীষণ অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে।’


খড়খড়ি বাইপাসের আড়তদার শরিফুল ইসলাম বলেন, এভাবে জ্বালানি তেলের সংকট হলে রাজশাহীসহ পুরো বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষ মাঠে মারা পড়বে। কৃষকদের মাঠ থেকে আনা কাঁচা শাকসবজি মোকামে তোলার পরও তা ঢাকায় পাঠাতে পারছি না। এতে পণ্যেও যেমন পচন ধরছে, তেমনি লোকসানও হচ্ছে। গাড়ির অভাব, তেলের অভাব ছাড়াও কৃষকরা ন্যায্যমূল্য না পেয়ে আড়তদারদের দুষছেন।’


এ প্রসঙ্গে রাজশাহী চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মাকসুদুর রহমান রিংকু বলেন, ডিজেলের অভাবে শুধু পণ্যবাহী ট্রাক নয়, কৃষকের সেচকাজেও সমস্যা হচ্ছে। এখন আম, লিচু, ধানের সময়। এ সময় পানি না পেলে কৃষকরা কীভাবে চাষাবাদ করবেন। আর বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির প্রধান উৎসই গভীর নলকূপ, যা তেল ছাড়া চলে না। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের বাঁচাতে হলে জ্বালানি তেলের কতটা দরকার।


এখানে কিছু উচ্চপর্যায়ের সিন্ডিকেট আছে, যারা পেট্রল-ডিজেল নিয়ে ছেলেখেলা করছে। এ নিয়ে জেলার পাম্প মালিকদের সঙ্গে বসেছিলাম। তাদেরও অভিযোগ, প্রয়োজনমাফিক তেল তারা পাচ্ছেন না। যেখানে লাগবে দিনে ১৫ হাজার লিটার, সেখানে সরকার দিচ্ছে পাঁচ হাজার লিটার। সরকারের এ বিষয়ে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা এবং তেল নিয়ে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট হয়ে থাকলে তা কঠোরভাবে তদারক করা উচিত।’


জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি মনিমুল ইসলাম বলেন, সরকার থেকে তেল দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তা অপ্রতুল। আগে যেখানে ১৫-১৭ হাজার লিটার ডিজেল পেতাম এখন পাচ্ছি মাত্র ৯-১৩ হাজার লিটার। এখন বোরো মৌসুম। চাহিদা আরও বেশি। তাছাড়া গ্রীষ্মের ঠিক আগমুহূর্তে আম, লিচুসহ কমবেশি সব ধরনের ফসলেই পানি লাগে বেশি। সেক্ষেত্রে গ্রামাঞ্চলে কৃষিতে ব্যবহৃত ডিজেলচালিত শ্যালো মেশিন, ট্রাক্টর, ভটভটিগুলো তেল পাচ্ছে না। 


ডিজেল ঘাটতির ফলে উত্তরাঞ্চলে অর্থনৈতিক বিপর্যয় প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রাজশাহী জেলা সভাপতি আহমদ শফিউদ্দিন বলেন, সরকারের উচিত দেশে জরুরি কাজে নিয়োজিত পরিবহনগুলোর জ্বালানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা এবং অপ্রয়োজনীয় যান চলাচল বন্ধ করা। একই সঙ্গে পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে লাগাম টেনে ধরলে জাতীয় পর্যায়ে জ্বালানি সাশ্রয় হবে, অর্থনীতির চাকাও মোটামুটি সচল থাকবে।