সোমবার, জুন ২২, ২০২৬

সরকারি কর্মীদের বেতন ৪০০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব

সোনার দেশ ডেস্ক ২৭ মে ২০২৬ ০৯:২৪ অপরাহ্ন আন্তর্জাতিক
সোনার দেশ ডেস্ক ২৭ মে ২০২৬ ০৯:২৪ অপরাহ্ন
সরকারি কর্মীদের বেতন ৪০০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব
৮ম পে কমিশনের অনেকগুলো প্রস্তাব নিলে চলছে গণশুনানি। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের বহুল প্রতীক্ষিত অষ্টম পে কমিশন স্রেফ একটি রুটিনমাফিক বেতন সংশোধনের প্রক্রিয়া পেরিয়ে এখন বড় ধরনের জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। কর্মচারীদের বেতন ও পেনশন বৃদ্ধির দাবির বিপরীতে সরকারের আর্থিক সাধ্য ও বাজেটের ওপর চাপ নিয়ে এখন নীতিনির্ধারক মহলে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।


এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি প্রস্তাব, যা গৃহীত হলে উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন ৪০০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে।


অষ্টম পে কমিশনের চলমান আলোচনা ও গণশুনানিতে অন্যতম প্রধান অংশীদার ‘ইন্ডিয়ান রেলওয়ে টেকনিক্যাল সুপারভাইজার্স অ্যাসোসিয়েশন’ একটি অভূতপূর্ব প্রস্তাব পেশ করেছে। বিগত পে কমিশনগুলোর প্রথা ভেঙে এবার সব স্তরের কর্মচারীদের জন্য অভিন্ন ফিটমেন্ট ফ্যাক্টরের পরিবর্তে পে-লেভেল অনুযায়ী আলাদা পাঁচটি ফিটমেন্ট ফ্যাক্টরের দাবি জানিয়েছে তারা।


প্রস্তাবিত সূত্র অনুযায়ী:

লেভেল ১ থেকে ৫: ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর ২.৯২

লেভেল ৬ থেকে ৮: ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর ৩.৫০

লেভেল ৯ থেকে ১২: ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর ৩.৮০

লেভেল ১৩ থেকে ১৬: ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর ৪.০৯

লেভেল ১৭ থেকে ১৮: ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর ৪.৩৮


এই প্রস্তাব গৃহীত হলে বেতনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটবে। উদাহরণস্বরূপ, লেভেল ১৭ বা ১৮-এর একজন শীর্ষ কর্মকর্তা, যার বর্তমান মূল বেতন ২ দশমিক ৫ লাখ রুপি, প্রস্তাবিত ৪ দশমিক ৩৮ ফ্যাক্টর অনুযায়ী তাঁর নতুন সংশোধিত মূল বেতন দাঁড়াবে প্রায় ১০ দশমিক ৯৫ লাখ রুপি।


একইভাবে মধ্যস্তরের কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও (লেভেল ৬ থেকে ৮) ৪৫ হাজার রুপি মূল বেতন একলাফে বেড়ে ১ দশমিক ৫৭ লাখ রুপি হতে পারে।


অ্যাসোসিয়েশনের যুক্তি, বর্তমান বেতন কাঠামোতে জুনিয়র এবং সিনিয়র কর্মীদের বেতনের ব্যবধান অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে রেলের মতো স্পর্শকাতর প্রযুক্তিগত বিভাগে যেখানে নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত, সেখানে এই অসংগতি দূর করা জরুরি। এ ছাড়া কারিগরি কর্মীদের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো, ৫ শতাংশ বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি এবং মূল বেতনের সঙ্গে ৫০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) একীভূত করার দাবিও জানানো হয়েছে।


‘ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর’ কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?

পে কমিশনের বেতন নির্ধারণের মূল চাবিকাঠি হলো ‘ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর’ । এটি মূলত একটি গুণক ফর্মুলা, যা বর্তমান মূল বেতনের সঙ্গে গুণ করে নতুন মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়।


সপ্তম পে কমিশনে এই ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর ছিল ২ দশমিক ৫৭। এবার বিভিন্ন কর্মচারী ইউনিয়ন আরও অনেক বেশি দাবি করছে। কেউ ৩ দশমিক ৮৩ ফ্যাক্টরের দাবি জানিয়েছে, আবার ‘ভারতীয় প্রতিরক্ষা মজদুর সংঘ’ ৪.০ ফিটমেন্ট ফ্যাক্টরসহ ন্যূনতম বেতন ৭২ হাজার রুপি করার দাবি তুলেছে। ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল-জয়েন্ট কনসালটেটিভ মেশিনারি’ ন্যূনতম বেসিক পে ৬৯ হাজার রুপি করার দাবি জানিয়েছে।


সরকারের উভয়সংকট

কর্মচারীদের মধ্যে চরম উত্তেজনা ও প্রত্যাশা থাকলেও বিশ্লেষকদের মনে বড় প্রশ্ন—ভারত সরকার কি এই বিশাল আর্থিক বোঝা বহন করতে পারবে?


ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা আড়ালে স্বীকার করছেন যে সব দাবি হয়তো মানা সম্ভব হবে না। কারণ সরকারকে একদিকে কর্মী কল্যাণ এবং অন্যদিকে রাজকোষের ওপর চাপ, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও ভবিষ্যৎ পেনশন দায়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।


ফিটমেন্ট ফ্যাক্টর অতিরিক্ত বাড়ানো হলে তা কেবল তাৎক্ষণিক বেতনই বাড়াবে না, বরং গ্র্যাচুইটি, পেনশন, অন্যান্য ভাতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অবসরকালীন আর্থিক দায় বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। কেবল কেন্দ্র নয়, ঐতিহাসিকভাবে কেন্দ্রীয় পে কমিশনের সুপারিশের পর রাজ্য সরকারগুলোও তাদের নিজস্ব বেতন কাঠামো সংশোধন করে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।


এ কারণে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, সরকার শেষ পর্যন্ত একটি মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে পারে। মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর ভিত্তি করে কিছু যৌক্তিক দাবি মানা হলেও চরম প্রস্তাবগুলো কিছুটা হ্রাস করা হতে পারে।


পরিবার কাঠামোর সংজ্ঞা বদল ও ওপিএস বিতর্ক

ইউনিয়নগুলোর আরেকটি অন্যতম জোরালো দাবি হলো—বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘ফ্যামিলি ইউনিট’ বা পরিবারের সদস্য সংখ্যার ফর্মুলা ৩ জন থেকে বাড়িয়ে ৫ জন করা। তাদের দাবি, আধুনিক জীবনযাত্রায় আবাসন, চিকিৎসা এবং সন্তানদের শিক্ষার খরচ যেভাবে বেড়েছে, তাতে স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান ছাড়াও বয়োবৃদ্ধ বাবা-মায়ের দায়িত্ব সামলাতে কর্মীরা হিমশিম খাচ্ছেন।


পাশাপাশি দীর্ঘদিনের বিতর্কিত ‘পুরোনো পেনশন প্রকল্প’ (ওপিএস) ফিরিয়ে আনার দাবিও বহাল রয়েছে। তবে দীর্ঘ বছর ধরে জাতীয় পেনশন ব্যবস্থা (এনপিএস) চালুর পর তা পুরোপুরি বাতিল করা বাস্তবসম্মত নয় বলে স্বীকার করছেন অনেক ইউনিয়ন নেতাই। ফলে সম্পূর্ণ ওপিএস-এ ফেরার চেয়ে এখন জোর দেওয়া হচ্ছে ‘ওপিএস-এর মতো সুবিধা’ বা ন্যূনতম নিশ্চিত পেনশনের গ্যারান্টির ওপর।


দেশজুড়ে গণশুনানি

অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি রঞ্জনা প্রকাশ দেশাইয়ের নেতৃত্বে গঠিত অষ্টম পে কমিশন ইতিমধ্যেই রাজধানী দিল্লিসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গণশুনানি ও অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক শুরু করেছে।


কমিশন আগামী ৬ ও ৭ জুলাই ভুবনেশ্বরে সফর করার ঘোষণা দিয়েছে। এরপর লখনউ, হায়দরাবাদ, শ্রীনগর, লাদাখ এবং জম্মু-কাশ্মীরেও কর্মচারী ইউনিয়ন ও পেনশনভোগী সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করবে।


২০২৫ সালের ৩ নভেম্বর গঠিত এই কমিশনের সুপারিশের ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ কর্মী, পেনশনভোগী এবং তাদের পরিবারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। ১৯৪৬ সাল থেকে প্রতি দশকে এই পে কমিশন গঠনের ঐতিহ্য চলে আসছে। তবে বর্তমানের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি এবং অভ্যন্তরীণ আর্থিক চাপের মুখে এই অষ্টম পে কমিশনের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।