সোমবার, জুন ২২, ২০২৬

বিশ্বকাপ ঘিরে ঘরের নারীদের নির্ঘুম রাত ও বাঁধভাঙা আবেগ

ইরম তারান্নুম প্রজ্ঞা ১১ জুন ২০২৬ ১১:৫৬ অপরাহ্ন বিশ্বকাপ
ইরম তারান্নুম প্রজ্ঞা ১১ জুন ২০২৬ ১১:৫৬ অপরাহ্ন
বিশ্বকাপ ঘিরে ঘরের নারীদের নির্ঘুম রাত ও বাঁধভাঙা আবেগ

বিশ্বকাপ ফুটবলের বাঁশি বাজলেই বদলে যায় চেনা পৃথিবীর চেনা সমীকরণ। পাড়া-মহল্লা, চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়া—সব জায়গাতেই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ফুটবল। কারও হাতে মোবাইল, কারও সামনে টেলিভিশন। পর্দাজুড়ে ৯০ মিনিটের উত্তেজনা-গোলের অপেক্ষা, হারের শঙ্কা আর জয়ের স্বপ্ন। সবুজ গালিচার ২২ জন খেলোয়াড়কে ঘিরে যে উন্মাদনা, তা কোনো কাঁটাতার বা লিঙ্গের সীমানায় আটকে থাকে না। 

একসময় বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেবলই পুরুষালি আড্ডার অনুষঙ্গ ভাবা হলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই মঞ্চে যুক্ত হয়েছে এক বিশাল নারী শক্তি। আজকের দিনে নারী ও বিশ্বকাপের সম্পর্ক শুধু টিভির সামনে বসে থাকার সরল সমীকরণ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গভীর আবেগ, খেলার নিখাদ বিশ্লেষণ আর চেনা ছক ভেঙে এক জাদুকরী মুক্তির গল্প।

কাপ যাবে কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশে। কিন্তু এই এক মাস ধরে অসংখ্য নারীর মনে ফুটবল যে বাঁধভাঙা উল্লাস আর অধিকারের গল্প বুনে গেল, আসল জয় তো সেখানেই। মাঠের ২২ জন ফুটবলারের পায়ের জাদুতে যখন অসংখ্য নারীর হৃদয় এক সঙ্গে স্পন্দিত হয়, তখন সমাজকে মেনে নিতেই হয় ফুটবলের আবেগটা শুধু ছেলেদের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়।

সমাজে এখনো একটা প্রচলিত ধারণা দেখা যায়, মেয়েরা কেবলই বড় কোনো খেলোয়াড় বা আকর্ষণীয় জার্সির টানে বিশ্বকাপ দেখে। কিন্তু এই ধারণা যে কতটা মলিন তা প্রমাণ করছেন বর্তমান প্রজন্মের নারী সমর্থকেরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জেরিন ছোটবেলা থেকেই ব্রাজিলের অন্ধ ভক্ত। তবে তার এই ফুটবল প্রেমের ভিত্তি কেবলই অন্ধ আবেগ নয়। জেরিন বলেন, যারা ভাবেন মেয়েরা ফুটবলের ‘অফসাইড’ বোঝে না, তারা আসলে এখনো ভুল ধারনার অফসাইডেই পড়ে আছেন। আমরা কেবল গোলপোস্টে বল জড়ানোর আনন্দটুকু নিই না; মাঝমাঠের পাসিং একুরেসি  কিংবা কাউন্টার অ্যাটাকের মারপ্যাঁচ, সবটাই মাথায় রাখি। প্রিয় দল হারলে যেমন চোখ দিয়ে জল পড়ে, তেমনি কোচের ভুল ট্যাকটিকস নিয়ে তর্কও করতে পারি।

তবে নেতিবাচক মন্তব্য বা সামাজিক কটূক্তিকে পাশ কাটিয়ে ফুটবলকে নিজেদের আনন্দের খোরাক বানিয়ে নিয়েছেন গৃহিণী শাকিলা আকতার। দিনভর সংসারের খাটুনি শেষে রাত জেগে খেলা দেখা তার কাছে এক পরম মুক্তি। শাকিলা বলেন, সারাদিনের কাজের পর যখন খেলা দেখতে বসি, তখন সব ক্লান্তি উধাও হয়ে যায়। ব্রাজিল যখন হারে, মনটা ভীষণ খারাপ হয়। পরদিন সংসারের সংসারের অনেকগুলো কাজ থাকে , তবু এই ৯০ মিনিটের উত্তেজনা আর আবেগ আমি কোনোভাবেই মিস করতে চাই না। ফুটবল আমার কাছে একটা উৎসবের মতো।”

ফুটবলের এই জোয়ারে সব অভিজ্ঞতা যে ইতিবাচক, তা কিন্তু নয়। খেলা দেখতে গিয়ে বা নিজের মতামত প্রকাশ করতে গিয়ে এখনো অনেক নারীকে নানামুখী নেতিবাচক মন্তব্যের মুখোমুখি হতে হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাসনিম রহমান সেই অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করলেন কিছুটা ক্ষোভের সঙ্গে, আমি যখন বন্ধুদের আড্ডায় জার্মানির দুর্বলতা নিয়ে কথা বলছিলাম, তখন এক সহপাঠী হেসেই উড়িয়ে দিলেন। বললেন, মেয়েরা কবে থেকে ফুটবল বোঝা শুরু করল? এই মানসিকতা এখনো সমাজ থেকে যায়নি। খেলায় হারলে যতটা কষ্ট পাই, তার চেয়ে বেশি কষ্ট পাই যখন আমাদের ফুটবল জ্ঞানকে শুধু মেয়ে হওয়ার কারণে ছোট করে দেখা হয়।


বিশ্বকাপ ঘিরে নারীদের আবেগ শুধু খেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রিয় দলের রঙে ওড়না, নেইলপলিশ, ছোট পতাকা সব মিলিয়ে ফুটবল তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। সন্তানের স্কুলের কাজ, রান্নাঘরের ব্যস্ততার মাঝেও চোখ থাকে স্কোরলাইনে। বিশ্বকাপ এলে খেলাধুলার সামগ্রী বিক্রির দোকানগুলোতে মেয়েদের জার্সির চাহিদা এখন আকাশচুম্বী।