সোমবার, জুন ২২, ২০২৬

‘সেভেন আপ’ স্মৃতি ফেরাল জার্মানি

সোনার দেশ ১৫ জুন ২০২৬ ০১:২২ পূর্বাহ্ন খেলা
সোনার দেশ ১৫ জুন ২০২৬ ০১:২২ পূর্বাহ্ন
‘সেভেন আপ’ স্মৃতি ফেরাল জার্মানি

বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই শক্তির এমন প্রদর্শনী করল জার্মানি, যা শুধু একটি বড় জয় নয়, বরং পুরো টুর্নামেন্টের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের উদ্দেশে এক স্পষ্ট সতর্কবার্তা! হিউস্টনের আলো ঝলমলে দিনে আজ ক্যারিবীয় দ্বীপদেশ কুরাসাওকে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত করে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা জানিয়ে দিল, তারা এবারও শিরোপার অন্যতম দাবিদার।


ফুটবল বিশ্ব দেখলো- ব্রাজিলের পর কুরাসাও, বিশ্বকাপে জার্মানির ‘সেভেন আপ’ অধ্যায়ের নতুন সংযোজন!


ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল, আক্রমণের গতি এবং কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্বে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখে জার্মানি। প্রথমার্ধে তিন গোল করে তারা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। তবে কুরাসাওও একসময় সাহসের পরিচয় দিয়েছিল। ম্যাচের ২১ মিনিটে সমতায় ফিরেছিল দলটি। সেই মুহূর্তে হয়তো মনে হয়েছিল, বিশ্বকাপের নতুন অতিথি কিছুটা হলেও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে পারবে ইউরোপীয় শক্তিধরদের। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।


বিরতির পর যেন আরও ক্ষুধার্ত হয়ে মাঠে নামে জার্মানি। দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই তারা কুরাসাওয়ের রক্ষণভাগে অবিরাম চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। ৫২ মিনিটে ইয়োশুয়া কিমিখের নিখুঁত পাস থেকে গোল করে ব্যবধান বাড়ান জামাল মুসিয়ালা। সেই গোল যেন কুরাসাওয়ের প্রতিরোধের শেষ দেয়ালটুকুও ভেঙে দেয়।


এরপর ম্যাচ পরিণত হয় একতরফা আক্রমণ-অনুশীলনে। আক্রমণে উঠে এসে ৬৮ মিনিটে গোল করেন লেফটব্যাক নাথানিয়েল ব্রাউন। আধুনিক ফুটবলে ফুলব্যাকদের আক্রমণাত্মক ভূমিকার আরেকটি নিখুঁত উদাহরণ হয়ে থাকে সেই মুহূর্ত। দশ মিনিট পর ডেনিজ উনদাভ গোল করে ব্যবধান ৬-১ করেন। তখনই স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে ভেসে উঠতে শুরু করে এক পুরোনো স্মৃতির ছায়া।


ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ম্যাচ ২০১৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে জার্মানির ৭-১ জয় এখনও বিশ্ব ফুটবলের স্মৃতিতে অমলিন। হিউস্টনের এই ম্যাচে যখন স্কোরলাইন একই পথে এগোচ্ছিল, তখন অনেক দর্শকের মনেই ফিরে আসে সেই ‘মিনেইরাজো ট্র্যাজেডি’র স্মৃতি। শেষ পর্যন্ত ৮৮ মিনিটে কাই হাভার্টজ নিজের দ্বিতীয় গোল করে স্কোরলাইনকে নিয়ে যান সেই প্রতীকী সংখ্যায়-৭।


তবে এই ম্যাচের গল্প শুধুমাত্র জার্মানির গোল উৎসব নয়। এটি কুরাসাওয়ের গল্পও। মাত্র দুই লাখের কম জনসংখ্যার একটি দ্বীপদেশ, যার আয়তন মাত্র ৪৪৪ বর্গকিলোমিটার। বিশ্বকাপের ইতিহাসে জনসংখ্যা এবং ভৌগোলিক আয়তনের বিচারে এত ছোট কোনো দেশ আগে আসরে অংশ নেয়নি। একসময় ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের ১৫০-এর বাইরের একটি দল আজ বিশ্বের সেরা ৪৮ দলের মঞ্চে দাঁড়িয়েছে—এটাই তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন।


কিন্তু বিশ্বকাপের নির্মম বাস্তবতা হলো, এখানে সহানুভূতির কোনো স্থান নেই। ছোট দেশ কিংবা বড় দেশ—সবাইকে একই মানদণ্ডে বিচার করা হয়। কুরাসাও সেই কঠিন সত্যটিই উপলব্ধি করল জার্মানির বিপক্ষে। এক মুহূর্তের আত্মবিশ্বাস, একটি সমতার গোল কিংবা সাহসী মনোভাব-এসবই যথেষ্ট নয়, যখন প্রতিপক্ষের নাম জার্মানি এবং তারা নিজেদের সেরা ছন্দে থাকে।


প্রথম ম্যাচেই সাত গোলের এই জয় জার্মানিকে শুধু তিন পয়েন্ট দেয়নি, দিয়েছে আত্মবিশ্বাস, গোল ব্যবধানের বড় সুবিধা এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের মনে এক ধরনের মানসিক চাপ। অন্যদিকে কুরাসাওয়ের জন্য এটি হতাশার রাত হলেও শেখার এক মূল্যবান অভিজ্ঞতা। কারণ বিশ্বকাপে পৌঁছানোই তাদের জন্য ইতিহাস, আর সেই ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে হিউস্টনের এই রাতও।


শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি হয়তো ফুটবলপ্রেমীদের কাছে আরও একটি কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ব্রাজিল হোক কিংবা কুরাসাও, জার্মানির সাত গোলের গল্প যেন বারবার ফিরে আসে ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে। আর বাংলাদেশি সমর্থকদের জনপ্রিয় ফুটবল অভিধানে সেই গল্পের নাম একটাই-‘সেভেন আপ’।