বাংলাদেশে কমছে যুক্তরাজ্যের অর্থসহায়তা, ঝুঁকিতে হাজারো মানুষ
যুক্তরাজ্যের বৈদেশিক সহায়তা কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় পরিচালিত একটি বড় প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই বন্ধ করতে হচ্ছে। এতে সুন্দরবন এলাকার হাজারো ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ সহায়তা থেকে বঞ্চিত হবেন। একই সঙ্গে গত আড়াই বছরে করা বিভিন্ন উদ্যোগও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্রিটিশ উন্নয়ন সংস্থা প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশের সুন্দরবন এলাকায় এই প্রকল্পের একটি অংশ পরিচালনা করে আসছে। প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত চলার কথা ছিল। এর লক্ষ্য ছিল কয়েক হাজার পরিবারের জীবনযাত্রার উন্নয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় তাদের সক্ষমতা বাড়ানো।
প্রকল্পের আওতায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, জলবায়ু সহনশীল কৃষি, মাছ চাষের প্রযুক্তি ও উপকরণ এবং অতিবৃষ্টি ও ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়।
কিন্তু চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনকে জানানো হয়, জুনের মধ্যেই প্রকল্পটি শেষ করতে হবে। পরে সংস্থাটির তীব্র প্রচেষ্টার পর সময়সীমা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন বাংলাদেশের জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের প্রধান তামান্না রহমান জানান, ২০২৬ সালের মধ্যে প্রকল্পটির জন্য ২২ লাখ পাউন্ড পাওয়ার কথা থাকলেও তারা এর তুলনায় অনেক কম অর্থ পেয়েছেন। ফলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ ৫৭ হাজার মানুষের কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্য থাকলেও শেষ পর্যন্ত প্রায় ৩৭ হাজার মানুষকে সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, হঠাৎ করে প্রকল্প বন্ধের সিদ্ধান্ত স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সংস্থাটির দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে নেওয়া উদ্যোগগুলোর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশকে দেওয়া দ্বিপক্ষীয় সহায়তাও বড় ধরনের কাটছাঁটের মুখে পড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই সহায়তার পরিমাণ ৬ কোটি ৬৭ লাখ পাউন্ড থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৩ কোটি ১০ লাখ পাউন্ডে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বড় ঝুঁকিতে সুন্দরবন
গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর মিলনস্থলের বিশাল বদ্বীপ এলাকায় অবস্থিত সুন্দরবন বিশ্বের সবচেয়ে বড় জোয়ারভাটা-নির্ভর ম্যানগ্রোভ বন। প্রায় ১০ হাজার ২৭৭ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই বনাঞ্চলে বাঘ, নদীর ডলফিনসহ বিভিন্ন প্রাণী ও প্রায় ৩০০ প্রজাতির পাখি রয়েছে।
সুন্দরবনের আশপাশের অনেক মানুষ দীর্ঘদিন ধরে মাছ, জ্বালানি কাঠ ও মধু সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। অনেকেই এখন কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত হলেও দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে তারা বাংলাদেশের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রয়েছেন।
২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার ক্ষতও এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি অনেক পরিবার। ওই ঘূর্ণিঝড়ে সুন্দরবন এলাকায় ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছিল এবং অনেক এলাকার ভূপ্রকৃতিও বদলে যায়।
এর পাশাপাশি সুন্দরবন এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বছরে প্রায় ৩ সেন্টিমিটার করে বাড়ছে, যা বৈশ্বিক গড়ের প্রায় দ্বিগুণ। এর ফলে অনেক বসতি হুমকির মুখে পড়ছে এবং লবণাক্ততার কারণে কৃষিজমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে।
কালাবগী গ্রামের বাসিন্দা বিনা মণ্ডল জানান, আইলার আগে তাদের গ্রামে প্রশস্ত রাস্তা, ভালো কৃষিজমি ও ফলের গাছ ছিল। ঘূর্ণিঝড়ে রাস্তা ও বাঁধ ধ্বংস হওয়ার পর তাদের পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে মাছ ধরা।
বিশুদ্ধ পানির সংকটও রয়েছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করেই অনেক সময় পানির চাহিদা মেটাতে হয়। মাছের পরিমাণ কমে যাওয়ায় আয়ও কমেছে। বিনা মণ্ডলের পরিবারকে অনেক সময় দিনে মাত্র একবেলা খাবার রান্না করতে হয়।
প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের দেওয়া একটি ছোট সৌরপ্যানেল তার পরিবারের জন্য বড় সহায়তা হয়েছে। তিনি জানান, সৌরবিদ্যুতের কারণে সন্ধ্যার পরও কাজ করতে পারছেন এবং আয় বাড়ছে। আগে মাছ ধরে মাসে প্রায় ২ থেকে ৩ হাজার টাকা আয় হলেও এখন তা বেড়ে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে।
আরেক বাসিন্দা বসন্তী মণ্ডল পেয়েছেন সৌরবিদ্যুৎচালিত ধান ভাঙানোর মেশিন। আগে তাকে প্রতিদিন বিভিন্ন কৃষকের বাড়িতে কাজের সন্ধানে যেতে হতো। এখন বাড়িতে থেকেই আয় করতে পারছেন এবং সন্তানদের সময় দিতে পারছেন।
অনেক উদ্যোগ মাঝপথে থেমে যাবে
প্রকল্পটি দ্রুত বন্ধের সিদ্ধান্তে স্থানীয় অনেক মানুষ হতাশ হয়েছেন। প্রকল্পের কর্মীরা জানান, কেউ কেউ এই সিদ্ধান্ত শুনে কেঁদেছেন। অনেকেই বুঝতে পারছেন না, যখন প্রকল্পের বিভিন্ন উদ্যোগের সুফল পাওয়া শুরু হয়েছে, তখনই কেন সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।
এমনকি ১৪০ জন উদ্যোক্তাকে নিয়ে নেওয়া একটি উদ্যোগও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। এসব উদ্যোক্তাকে প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে এবং ব্যবসা পরিচালনার প্রাথমিক প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেলে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রশিক্ষণের অভাবে তারা আবার আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারেন বলে আশঙ্কা করছে প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন।
তামান্না রহমান বলেন, প্রকল্পটি ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চলার কথা থাকলেও মাত্র দুই থেকে তিন মাসের নোটিশে তা গুটিয়ে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন। সাধারণত কোনো প্রকল্প শেষ করার আগে স্থানীয় জনগণকে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং স্থানীয় সরকারের কাছে কার্যক্রম হস্তান্তরের পরিকল্পনা থাকে। এবার সে কাজ পুরোপুরি করা সম্ভব হচ্ছে না।
নতুন অর্থের সুযোগও মিলছে না
প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন প্রকল্পটি চালিয়ে নিতে বিভিন্ন ফাউন্ডেশনের কাছ থেকে নতুন অনুদান পাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে হঠাৎ করে প্রকল্প বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় নতুন অর্থের ব্যবস্থা করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যাচ্ছে না।
তামান্না রহমান বলেন, বাংলাদেশের মতো ১৭ কোটি মানুষের দেশে বিদেশি সরকারগুলোর অনুদান দিয়ে সবাইকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা সম্ভব নয়। তবে সবচেয়ে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করাও কঠিন।
তার মতে, সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের উল্লেখযোগ্য নগদ আয় নেই। ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকে যোগাযোগ ও অবকাঠামো ব্যবস্থাও দুর্বল। ফলে এসব এলাকায় বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা কঠিন।
বেসরকারি খাতের মাধ্যমে জলবায়ু অভিযোজনের অর্থায়ন নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। উন্নয়ন সংস্থা মার্সি কর্পসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জলবায়ু অভিযোজনের অর্থায়নের প্রয়োজনের মাত্র ৩ শতাংশ এখন পর্যন্ত বেসরকারি খাত থেকে এসেছে।
যুক্তরাজ্যের উন্নয়ন সংস্থাগুলোর নেটওয়ার্ক বন্ডের প্রধান রোমিলি গ্রিনহিল বলেন, যুক্তরাজ্যের অর্থায়নে পরিচালিত মানবিক ও জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য বড় ধাক্কা।
তিনি যুক্তরাজ্য সরকারকে বৈদেশিক সহায়তা আরও কমানো বন্ধ করা এবং দেশটির মোট জাতীয় আয়ের ০.৭ শতাংশ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সহায়তা ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে যুক্তরাজ্যের বৈদেশিক উন্নয়ন দপ্তর (এফসিডিও) জানিয়েছে, তারা অনুদানভিত্তিক বৈদেশিক সহায়তার পরিমাণ কমিয়ে সরকারগুলোর সঙ্গে সরাসরি অংশীদারত্ব বাড়াতে চায়। এর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের সরকারি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং বেসরকারি অর্থায়ন কাজে লাগানোর লক্ষ্য রয়েছে।
তবে তামান্না রহমানের আশঙ্কা, বাংলাদেশের প্রত্যন্ত ও দুর্গম সুন্দরবন এলাকায় সরাসরি সরকারের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে। তাঁর মতে, এসব এলাকায় কাজ করার মতো প্রয়োজনীয় জনবল, দক্ষতা ও সক্ষমতা সরকারের সবসময় থাকে না।
তথ্যসূত্র: দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট, জাগোনিউজ