বুধবার, নভেম্বর ০৪, ২০২৬

দানবীয় ইগল ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে গিয়ে ছিঁড়ে খেত আদিম মানবশিশুদেরও!

সোনার দেশ ডেস্ক ০৩ নভেম্বর ২০২৬ ০১:৩৬ অপরাহ্ন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
সোনার দেশ ডেস্ক ০৩ নভেম্বর ২০২৬ ০১:৩৬ অপরাহ্ন
দানবীয় ইগল ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে গিয়ে ছিঁড়ে খেত আদিম মানবশিশুদেরও!
ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।

লক্ষ লক্ষ বছর আগে পৃথিবী থেকে ডাইনোসরেরা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আদিম মানুষের বিপদ কাটেনি। ডাইনোসর পরবর্তী সময়ে আধুনিক মানুষের পূর্বসূরি এবং মানবজাতীয় অন্য প্রাণীদের ত্রাস হয়ে উঠেছিল দানবীয় সব পাখি। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, পৃথিবীতে হিমশীতল যুগ শুরু হওয়ার আগে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত আকাশে ‘রাজত্ব’ চালাত এরাই। দূর থেকে উড়ে এসে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যেত শিকার। আদিমানবের ছানারাও এদের শিকার হয়েছে বার বার। এমনকি, বিজ্ঞানীদের দাবি, আদিম থেকে আধুনিক মানুষের বিবর্তনে অনেকাংশে প্রভাব ফেলেছিল এই সমস্ত মাংসাশী শিকারি পাখি। তাদের কারও কারও ডানা ছিল প্রায় ২০ ফুট লম্বা!


১৯২৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার তাউং অঞ্চলে এক আদিম মানবশিশুর মাথার খুলির জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়েছিল। পরে জানা যায়, তা মানুষের পূর্বসূরি অস্ট্রালোপিথেকাস আফ্রিকানাস প্রজাতির দেহাংশ। ওই শিশুর বয়স আনুমানিক তিন বছর। নৃতত্ত্ববিদদের অনুমান, প্রায় ২৮ লক্ষ বছর আগে সাভানার তৃণভূমিতে ঘুরে বেড়ানোর সময় শিশুটি বিশালাকায় কোনও ইগলজাতীয় প্রাণীর কবলে পড়ে। তার চোখের কোটরের নীচে যে সমস্ত ছিদ্র পাওয়া গিয়েছে, তা ইগলের নখের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। শিকারি পাখিদের দাপটের অন্যতম নির্দশন এই প্রাচীন জীবাশ্ম, মত বিশেষজ্ঞদের। সাভানার ওই শিশু এখন ‘তাউং শিশু’ নামে পরিচিত।


শুধু আকাশ নয়, জল-স্থলেও বিস্তর বিপদ ছিল মানুষের পূর্বসূরিদের জন্য। ম্যামথ থেকে শুরু করে মাস্টোডোন্‌স, বিশালাকায় স্তন্যপায়ীরা ঘুরে বেড়াত। তবে এই সময়ে শিকারি পাখিদের উত্থান ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, বিশাল গ্রহাণু এসে পৃথিবীকে ধাক্কা মারার পর যে প্রবল আলোড়ন হয়েছিল, তাতেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় ডাইনোসরেরা। ওই সময়ে ধুলোর চাদরে ঢেকে গিয়েছিল চারদিক। শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল গাছপালা। কিন্তু পাখিদের এই পরিস্থিতিতে কিছু সুবিধা হয়। তাদের শিকার করে খাওয়ার মতো কেউ আর অবশিষ্ট ছিল না মাটিতে। ছোট ঠোঁটযুক্ত কিছু বড় আকারের পাখি, যারা মূলত ভূমিকেন্দ্রিক জীবন কাটাত, তারা এই সময়ে বিবর্তিত হয়ে আকাশের দখল নেয়।


বিশালাকায় পাখিগুলির মধ্যে কেউ কেউ তৃণভোজী ছিল। উদাহরণ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার ড্রোমোর্নিথিডির কথা বলা যায়। এরা দেখতে অনেকটা সাধারণ হাঁসের মতো। কিন্তু আকারে একটি সাধারণ গরুর চেয়েও প্রায় ১০০ গুণ বড় এবং ভারী। কোনও কোনও মাংসাশী পাখি আবার সামুদ্রিক শিকারিতে পরিণত হয়েছিল। দক্ষিণ ক্যারোলিনার পেলাগোর্নিস স্যান্ডারসির ডানা ছিল প্রায় ২৪ ফুট দীর্ঘ। এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় উড়ন্ত পাখি তারাই। আমেরিকার ওহায়ো স্টেট ইউনিভার্সিটির প্রাইম্যাটোলজিস্ট স্কট ম্যাকগ্রা বলেন, ‘‘পৃথিবীতে প্রাইমেটদের পাশাপাশি বরাবর শিকারি পাখিদেরও অস্তিত্ব ছিল। আমাদের পূর্বসূরিরাও তাদের শিকার হয়েছে বার বার।’’ এই সমস্ত পাখির মোকাবিলা মানুষের বিবর্তনে প্রভাব ফেলেছে, মনে করেন ম্যাকগ্রা।


প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশালাকায় পাখিদের শিকার প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট ধাঁচে মানুষের বিবর্তনকে চালিত করেছিল। একমাত্র কারণ না হলেও এটা ছিল বিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ। উদাহরণ হিসেবে অনেকে বলেন, শিকারি পাখিদের দূর থেকে চিহ্নিত করা এবং তাদের দেখলে দ্রুত লুকিয়ে পড়ার জন্য দু’পায়ে উঠে দাঁড়ানোর প্রয়োজন ছিল। তা ছাড়া, যে কোনও বিপদের হাত থেকে বাঁচতে জোটবদ্ধ হয়ে থাকা, পারস্পরিক সহযোগিতা, নির্ভরশীলতা এবং একে অপরকে রক্ষা করার মানসিকতা ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল আদিম মানুষের মধ্যে। পাখিরা বাঘ বা সিংহের মতো দীর্ঘক্ষণ তাড়া করে শিকার ধরত না। বরং নির্দিষ্ট উচ্চতায় গাছের ডালে বা অন্য কোথাও লুকিয়ে সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করত। তার পর একসময় অতর্কিতে আক্রমণ করত। এই ধরনের হামলা এড়াতে আদিম মানুষের শারীরিক এবং মানসিক গঠন নির্দিষ্ট ধাঁচে বিবর্তিত হয়। ব্রিটেনের ব্রাইটন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ জেমস কোল মনে করেন, ভাষার উদ্ভবেও শিকারি পাখিদের অবদান ছিল। চোখের আড়ালে থাকা কাউকে সতর্ক করার জন্য ভাষার প্রয়োজন হত। শুধু ইশারায় তা সম্ভব ছিল না।


প্রাচীন আমেরিকার বিশালাকায় মাংসাশী পাখি ছিল টেরাটর্ন। এদের ডানা প্রায় ২০ ফুট লম্বা। যে কোনও শিকার ধরে এরা জীবন্ত গিলে ফেলতে পারত। আজ থেকে প্রায় ১০ হাজার বছর আগে এই পাখিরা বিলুপ্ত হয়ে যায়। অনেকের মতে, আমেরিকার প্রাচীন গল্পকথায়, পৌরাণিক কাহিনীতে পক্ষীশ্রেণির চরিত্রগুলি তৈরি হয়েছিল বাস্তবের টেরাটর্নদের অনুকরণেই। এ ছাড়া, দক্ষিণ ক্যালিফর্নিয়ায় আইওলোর্নিস ইনক্রেডিবিলিস, ওরেগনে টেরাটর্নিস উডবার্নেনসিসের মতো পাখির সন্ধান মিলেছে। তাদের ডানার দৈর্ঘ্য ১৪ থেকে ১৮ ফুটের মধ্যে। আবার, পৃথিবীর অপর প্রান্তে নিউজ়িল্যান্ডে বিশাল ইগলশ্রেণির যে সমস্ত শিকারি পাখির খোঁজ মিলেছে, তাদের মধ্যে অন্যতম হাস্ট্‌স ইগল। অনেকে একে ‘উড়ন্ত বাঘ’ বলার পক্ষপাতী।


তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন