বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ০৫, ২০২৬

বরখাস্ত হতে পারেন ট্রাম্প?

সোনার দেশ ডেস্ক ০৫ নভেম্বর ২০২৬ ০১:০৯ অপরাহ্ন আন্তর্জাতিক
সোনার দেশ ডেস্ক ০৫ নভেম্বর ২০২৬ ০১:০৯ অপরাহ্ন
বরখাস্ত হতে পারেন ট্রাম্প?

আমেরিকায় ‘নীল ঝড়’। মধ্যবর্তী (মিড টার্ম) নির্বাচনে ধরাশায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি। মার্কিন পার্লামেন্ট বা ‘কংগ্রেস’-এর দুই কক্ষেই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে তাঁর বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা। আইনসভার দখল পাওয়ায় এ বার কি ‘পোটাস’কেই (প্রেসিডেন্ট অফ দ্য ইউনাইটেড স্টেটস) ইমপিচ বা বরখাস্ত করবে তারা? ভোটের ফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই বাড়ছে সেই জল্পনা।


চলতি বছরের ৩ নভেম্বর মধ্যবর্তী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটের লাইনে দাঁড়ায় আমেরিকা। ফল প্রকাশের পর দেখা গিয়েছে, ‘কংগ্রেস’-এর নিম্নকক্ষ ‘হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভ’-এর ৪৩৫টির মধ্যে ২৩১ আসন জিতে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। অন্য দিকে, ১৩৯টি কেন্দ্রের জয় নিয়েই খুশি থাকতে হচ্ছে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টিকে। এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত ৬৫টি আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়নি।


একই ছবি দেখা গিয়েছে ‘কংগ্রেস’-এর উচ্চকক্ষ ‘সেনেট’-এ। সেখানকার আসন সংখ্যা ১০০, যার মধ্যে ৫৪টি দখল করেছে ‘গাধা’ প্রতীকে লড়া ডেমোক্র্যাটরা। ‘সেনেট’ রিপাবলিকানদের প্রতিনিধির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৪-এ। ব্যালটে যাঁদের প্রতীক ছিল ‘হাতি’। দু’টি আসনের ফল এখনও ঘোষিত হয়নি। ফলে, আগামী দু’বছর সরকার চালাতে ট্রাম্পকে পদে পদে ঠোক্কর খেতে হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের একাংশ।


দুঁদে কূটনীতিকদের কথায়, মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই ফলাফল মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য দুঃস্বপ্ন বয়ে আনতে পারে। কারণ, পার্লামেন্ট তথা ‘কংগ্রেসে’ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে তদন্ত শুরু করাতে পারে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা। তখন যে বিভিন্ন নথিপত্র ও সাক্ষীর ডাক পড়বে, তা বলাই বাহুল্য। পাশাপাশি, ‘পোটাস’কে বরখাস্ত বা ইমপিচের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সূচনার ক্ষমতাও রয়েছে তাদের হাতে।


সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে ইতিমধ্যেই গণমাধ্যমে মুখ খুলেছেন ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জ়েফ্রিস। সংবাদ সংস্থা ‘রয়টার্স’কে তিনি বলেন, ‘‘আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলাম মানেই যে প্রেসিডেন্টের ইমপিচ প্রক্রিয়া শুরু হবে, তার কোনও মানে নেই। তবে, সেই সম্ভাবনা আবার পুরোপুরি উড়িয়েও দিচ্ছি না। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আমাদের প্রথমে তদন্ত এবং প্রমাণ সংগ্রহের কাজ করতে হবে।’’


২০১৭-২১ সাল পর্যন্ত প্রথম দফায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন ট্রাম্প। ওই সময় দু’বার তাঁকে বরখাস্তের চেষ্টা করে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা। ফলে, ইমপিচ প্রক্রিয়ার মুখে পড়েন ‘পোটাস’। কিন্তু, ‘কংগ্রেস’-এর উচ্চকক্ষ ‘সেনেট’-এ রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় দু’বারই বিপদ এড়াতে সক্ষম হন আমেরিকার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। তবে, এ বার পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন।


উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে প্রথম বার বরখাস্ত বা ইমপিচ প্রক্রিয়ার সামনাসামনি হল ট্রাম্প। ওই সময় তাঁর বিরুদ্ধে ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ এবং ‘কংগ্রেস’কে তদন্তে বাধা দেওয়ার মতো মারাত্মক অভিযোগ ওঠে। ডেমোক্র্যাটদের দাবি, ওই বছরের জুলাইতে ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জ়েলেনস্কির সঙ্গে ফোনে কথা বলেন ডোনাল্ড। শুধু তা-ই নয়, তাঁকে সপুত্র জ়ো বাইডেনের বিরুদ্ধে তদন্ত করার জন্য চাপ দেন ‘পোটাস’।


বর্ষীয়ান ডেমোক্র্যাট বাইডেনকে গোড়া থেকেই নিজের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মনে করতেন ট্রাম্প। ২০০৯-১৭ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে ছিলেন বাইডেন। পরে অবশ্য ডোনাল্ডকে হারিয়েই ২০২১ সালে প্রেসিডেন্ট হন জড়ো। পদে ছিলেন ২০২৫ সাল পর্যন্ত। ‘নীল ব্রিগেড’-এর দাবি, বাইডেনকে প্যাঁচে ফেলতে জেলেনস্কিকে ‘দাবার ঘুঁটি’ হিসেবে ব্যবহার করেন ট্রাম্প, করেন ব্ল্যাকমেলও।


ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, জ়েলেনস্কির সঙ্গে ফোনালাপের পর তাঁর উপর চাপ তৈরি করতে ইউক্রেনকে দেওয়া ৪০ কোটি ডলারের মার্কিন সামরিক সাহায্য অস্থায়ী ভাবে আটকে দেন ট্রাম্প। ‘হোয়াটস হাউস’-এর প্রেসিডেন্ট দফতরের সেই হাঁড়ির খবর প্রকাশ্যে আসতেই নড়েচড়ে বসেন ‘হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভ’-এর অধ্যক্ষ ন্যান্সি পালোসি। ‘পোটাস’-এর বিরুদ্ধে বরখাস্ত প্রক্রিয়া আনার নির্দেশ দিয়ে ফেলেন তিনি।


তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, মার্কিন ‘কংগ্রেস’-এর নিম্নকক্ষ ‘হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভে’ ইমপিচ প্রস্তাব পাশ হলেও ‘সেনেটে’ আটকে যায় সেই প্রক্রিয়া। ফলে, ২০২০ সালে বেকসুর খালাস পেয়ে যান ট্রাম্প। পরের বছর (পড়ুন, ২০২১ সাল) ফের তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে তাঁকে বরখাস্ত করার দাবি তোলেন ডেমোক্র্যাটরা। এ বার ‘ক্যাপিটাল হিল দাঙ্গা’য় অভিযুক্ত হন ডোনাল্ড।


২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পকে হারিয়ে ক্ষমতা দখল করেন বাইডেন। পরের বছর (পড়ুন, ২০২১ সাল) ৬ জানুয়ারি তাঁর জয়ের ফলাফল অনুমোদনের জন্য মার্কিন ‘কংগ্রেসের’ বিশেষ অধিবেশন চলাকালীন হোয়াইট হাউসের সামনে দাঁড়িয়ে ‘উস্কানিমূলক’ মন্তব্য করেন ডোনাল্ড। তোলেন নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগও। এর পরই রীতিমতো হাতিয়ার নিয়ে ক্যাপিটাল হিলের পার্লামেন্ট চত্বরে ঢুকে পড়ে তাঁর দলের উগ্র সমর্থকরা।


এর পর বাইডেন প্রেসিডেন্ট হতেই ট্রাম্পকে ইমপিচ করার প্রক্রিয়ায় জোর দেয় তাঁর ডেমোক্র্যাটিক দল। ২০২১ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে তাতে সিলমোহর দেয় ‘হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভ’। তবে, এ বারও ‘সেনেট’-এ নীল ব্রিগেডের সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় বেঁচে যান ডোনাল্ড। ফলে, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেও কোনও সমস্যা হয়নি তাঁর।


মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বরখাস্তের প্রক্রিয়াটি কিন্তু বেশ জটিল। রাষ্ট্রদ্রোহিতা, ঘুষ নেওয়া, অন্য কোনও বড় অপরাধ ও অসদাচরণের জন্য ‘পোটাস’কে ইমপিচ করা যেতে পারে। এটি মোট দু’টি ধাপে বিভক্ত। প্রথমে ‘হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভে’ তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে তা পাস করাতে হবে। এর পর সেখানকার সদস্যরা বরখাস্ত সংক্রান্ত একটি তদন্ত পরিচালনা করবেন।


‘পোটাস’-এর বিরুদ্ধে বরখাস্ত প্রস্তাব পাশ করাতে ‘হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভে’ উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। দ্বিতীয় ধাপে প্রস্তাবটি যায় ‘সেনেটে’। সেখানে প্রতিটি অভিযোগের বিচার করা হয়। প্রেসিডেন্ট কুর্সিতে থাকলে এই প্রক্রিয়ার সভাপতিত্ব করেন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি। এতে জুরি হিসেবে থাকতে পারেন ‘কংগ্রেসে’র উচ্চকক্ষের সদস্যরা।


বিচারে প্রেসিডেন্ট দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁকে পদচ্যুত করতে ভোটাভুটি হবে ‘সেনেটে’। এই প্রস্তাব পাস করাতে উপস্থিত সদস্যের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন। এ বারের মিড টার্মে ‘কংগ্রেস’-এর দু’টি কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে ডোমেক্র্যাটরা। ফলে, ট্রাম্পের বরখাস্ত বা ইমপিচ হওয়ার আশঙ্কা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়ার নয়।


গত ২৫০ বছরের মার্কিন রাজনীতির ইতিহাসে এখনও পর্যন্ত ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়ার জেরে শেষমেশ বরখাস্ত বা পদচ্যুত হননি কোনও প্রেসিডেন্ট। ১৯৯৮ সালে যৌন কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত হন ৪২তম ‘পোটাস’ বিল ক্লিনটন। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক রয়েছে বলে দাবি করে রীতিমতো হইচই ফেলে দেন হোয়াইট হাউসের ইন্টার্ন মনিকা লিউইনস্কি। তার পরেও অবশ্য ক্লিনটনকে পদচ্যুত হতে হয়নি।


১৯৭৪ সালে ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়া শুরুর আগেই পদত্যাগ করেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠে বিরোধীদের ফোনে আড়ি পাতার অভিযোগ। ইতিহাসে যা ‘ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি’ নামে কুখ্যাত। এ ছাড়া, ১৮৬৮ সালে অ্যান্ড্রু জনসনের বিরুদ্ধেও বরখাস্ত প্রক্রিয়া আনা হয়েছিল। তবে সেটিও ধোপে টেঁকেনি।


ইমপিচ প্রক্রিয়ার মুখে পড়া মার্কিন প্রেসিডেন্টদের মধ্যে দু’জন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির। তাঁরা হলেন অ্যান্ড্রু জনসন ও বিল ক্লিনটন। অন্য দিকে, রিপাবলিক দল থেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন নিক্সন ও ট্রাম্প। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দাবি, পরিস্থিতি যে দিকে গড়াচ্ছে, তাতে বর্তমান ‘পোটাস’-এর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্তের রাস্তা খুলতে পারে ‘নীল ব্রিগেড’-এর হাতে থাকা ‘কংগ্রেস’।


আমেরিকার ইতিহাসে ট্রাম্পই একমাত্র প্রেসিডেন্ট, যিনি দু’বার ইমপিচ প্রক্রিয়ার মুখে পড়েছেন। তৃতীয় বারের চেষ্টায় তাঁকে ডেমোক্র্যাটরা বরখাস্ত করতে পারবে কি না, তা নিয়ে এখনও সন্দিহান বিশেষজ্ঞ মহল। তাঁদের দাবি, এই প্রক্রিয়া শুরু করতেই যথেষ্ট সময় লাগতে পারে। ফলে, শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, সেটিই এখন দেখার।


তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন