শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

বাজারে রং মেশানো মথ ডাল মুগ ডালের নামে বিক্রি, জনস্বাস্থ্যে বড় ঝুঁকি!

WP Import ৩১ অক্টোবর ২০২৫ ১১:২৯ অপরাহ্ন
WP Import ৩১ অক্টোবর ২০২৫ ১১:২৯ অপরাহ্ন
বাজারে রং মেশানো মথ ডাল মুগ ডালের নামে বিক্রি, জনস্বাস্থ্যে বড় ঝুঁকি!
বাজারে রং মেশানো মথ ডাল মুগ ডালের নামে বিক্রি, জনস্বাস্থ্যে বড় ঝুঁকি!

নিজস্ব প্রতিবেদক:


বাংলাদেশের বাজারে মুগ ডালের আড়ালে বিক্রি হচ্ছে ‘টারট্রাজিন’ নামের রং মেশানো মথ ডাল বা মাটকি। বাজার থেকে সংগ্রহ করা মুগ ডালের নমুনার অর্ধেকেরও বেশি টারট্রাজিন রঙে মিশ্রিত পাওয়া গেছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বলছেন, এই রং ডালে ব্যবহারের অনুমোদন নেই এবং এটি মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষ গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছেন।

সম্প্রতি বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের এক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বাজাওে ‘মুগ ডাল’ নামে বিক্রি হওয়া অনেক ডাল আসলে মথ ডাল, যা টারট্রাজিন নামক কৃত্রিম লেবু-হলুদ রং দিয়ে মুগ ডালের মতো করে বিক্রি করা হচ্ছে। মথ ডাল বা মাটকি হলো ছোট বাদামি রঙের একধরনের প্রোটিনসমৃদ্ধ ডাল, যা ভারতীয় উপমহাদেশে বেশ জনপ্রিয়। এতে প্রোটিন, ফাইবার ও খনিজ উপাদান থাকলেও রং মিশিয়ে বিক্রির ফলে তা স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে। অন্যদিকে টারট্রাজিন হলো কৃত্রিম রঞ্জক পদার্থ, যা সাধারণত পানীয় বা প্রসাধনসামগ্রীতে সীমিত মাত্রায় ব্যবহারের অনুমতি আছে-কিন্তু ডালে এর ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টারট্রাজিন রঙ মেশানো ডাল দীর্ঘদিন খেলে লিভার সিরোসিস, হজমের সমস্যা, কিডনি বিকল, হরমোনাল ভারসাম্যহীনতা ও অ্যালার্জিজনিত জটিলতা দেখা দিতে পারে।

রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. এসআইএম রাজিউল ইসলাম বলেন, ‘এই কেমিক্যাল মেশানো ডাল মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। দীর্ঘদিন খেলে লিভারে সংক্রমণ, হজমের সমস্যা ও লিভার সিরোসিস হতে পারে। এটি একপ্রকার বিষের মতো কাজ করে।’

রাজশাহী মেডিকেল কলেজের পুষ্টিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. তানিয়া আক্তার বলেন,‘টারট্রাজিন শুধু লিভার নয়, কিডনি ও হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে। শিশু ও গর্ভবতী নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন।’
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৩৫-৩৬ হাজার মেট্রিক টন মুগ ডাল উৎপাদিত হয়। কিন্তু দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৭৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর। এই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা ভারত থেকে সস্তা মথ ডাল এনে রং মিশিয়ে ‘মুগ ডাল’ হিসেবে বাজারজাত করছে। ভারত সরকার নিজ দেশে কেমিক্যালযুক্ত মথ ডাল বিক্রি নিষিদ্ধ করেছে। অথচ সেই নিষিদ্ধ ডালই সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।
রাজশাহীর নিরাপদ খাদ্য অফিসার মো. ইয়ামিন হোসেন বলেন,‘টারট্রাজিন রং ডালে ব্যবহারের অনুমোদন নেই। বাজারে মুগ ডালের আড়ালে মথ ডাল বিক্রি সম্পূর্ণ বেআইনি। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বিএসটিআই রাজশাহী বিভাগের পরিচালক জহুরা সিকদার বলেন,‘মথ ডাল বিএসটিআই অনুমোদিত পণ্যের তালিকায় নেই। তাই আমরা সরাসরি আমদানিতে ছাড়পত্র দিতে পারি না। সরকার যদি এটি তালিকাভুক্ত করে, আমরা পরীক্ষার মাধ্যমে ক্ষতিকারক উপাদান শনাক্ত করতে পারব।’

কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) রাজশাহী শাখার সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা মামুন বলেন, ‘রং মিশ্রিত ডাল বাজারজাত করা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ অনুযায়ী দ-নীয় অপরাধ। প্রমাণিত হলে দুই বছরের কারাদ- বা এক লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। ক্যাব ইতোমধ্যে তিনটি সরকারি সংস্থার কাছে লিখিত অভিযোগ পাঠিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন,‘প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুই বছরের কারাদ- অথবা এক লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। যদি রাজশাহীর কোনো প্রতিষ্ঠান বা আমদানিকারক এই অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকে এবং তদন্তে তা প্রমাণিত হয়, তাহলে আমরা ভোক্তাদের স্বার্থ আইনের শরণাপন্ন হব।’

সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে চলতি বছরে ৭ হাজার ৭৭৭ মেট্রিক টন মথ ডাল আমদানি হয়েছে বলে জানিয়েছেন বন্দরের কর্মকর্তারা। বন্দরের কোয়ারেন্টাইন উপপরিচালক শামীর চন্দ্র ঘোষ বলেন, ‘আমরা পণ্যের প্যাকেট ও ওজন যাচাই করি। কিন্তু কেমিক্যাল পরীক্ষা করার ল্যাব বা জনবল নেই। ভারত থেকে কী ধরনের পণ্য আসছে তা বিএসটিআই বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিশ্চিত করতে পারে। তিনি আরও জানান,‘ভারতীয় মথ ডালে কেমিক্যাল মেশানোর প্রমাণ পাওয়ায় এখন এর আমদানি বন্ধ আছে।’

রাজশাহীর বেলপুকুর ও বানেশ্বর এলাকার কয়েকটি বড় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ভারত থেকে মথ ডাল আমদানি করেছিল। বানেশ্বর এলাকার নিঝুম শস্য ভা-ার-এর মালিক মিনহাজ বলেন,‘আমরা জানতাম না এই ডালে কেমিক্যাল মেশানো আছে। জানতে পারার পরই আমদানি বন্ধ করেছি।’
বেলপুকুর এলাকার বিসমিল্লাহ ডাল মিলের ম্যানেজার আলতাফ হোসেন বলেন,‘সরকারি অনুমোদন দিলো বলেই আমরা বছরের শুরুতে কিছু মথ ডাল এনেছিলাম। এখন আর আমদানি করছি না।’