সোমবার, মে ১১, ২০২৬

রেকর্ড পরিমাণ পেঁয়াজ চাষ, দামে হতাশ

সোনার দেশ ০৩ মে ২০২৬ ১১:২৬ অপরাহ্ন সম্পাদকীয়
সোনার দেশ ০৩ মে ২০২৬ ১১:২৬ অপরাহ্ন
রেকর্ড পরিমাণ পেঁয়াজ চাষ, দামে হতাশ

বাম্পার ফলনের পরও কৃষকের দুঃখ কেন ঘোচে না

বাংলাদেশের কৃষি বহুদিন ধরেই জাতীয় সাফল্যের উজ্জ্বল উদাহরণ। একসময় খাদ্যঘাটতি ও দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে থাকা দেশ আজ কৃষি ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু এই সাফল্যকে পূর্ণাঙ্গ বলা কঠিন। কারণ কৃষক উৎপাদন বাড়ালেও তার আয় সে অনুপাতে বাড়ছে না। রোববার (৩ মে) সোনার দেশ পত্রিকায় ‘রেকর্ড পরিমাণ পেঁয়াজ চাষ, দামে হতাশ’-শিরোনামে একটি প্রধান প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।


সেখানে উল্লেখ আছে,  রাজশাহী অঞ্চলে চাষ হয়েছে রেকর্ড পরিমাণ পেঁয়াজ। লাভের আশায় ঋণ করে অনেকে চাষ করেছেন পেঁয়াজ। বাজারের পেঁয়াজের মুল্যের চেয়ে উৎপাদন খরচই বেশি হচ্ছে। আর এতেই হতাশ হচ্ছেন চাষিরা। গেল মৌসুমের মতো এই মৌসুমের ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন চাষিরা। এর জন্য দায়ী করছেন পেঁয়াজ আমদানিকে। আমদানি না হলে পেঁয়াজে ক্ষতি পুষিয়ে যেত বলে মনে করছেন পেঁয়াজ চাষিরা।


চাষিরা বাজারদর পতনের জন্য আগের পেঁয়াজ আমদানিকে দায়ী করছেন। তাই কৃষিকে শুধু উৎপাদনকেন্দ্রিক রাখলে চলবে না, তাকে হতে হবে কৃষককেন্দ্রিক, পুষ্টিসচেতন ও জলবায়ু সহনশীল। কৃষকের জন্য নানা উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবে তাদের কষ্ট কমছে না। সাম্প্রতিক আলু ও পেঁয়াজের দরপতন এর নির্মম উদাহরণ। আগের বছর ভালো দাম দেখে কৃষকরা বেশি বিনিয়োগ করেছিলেন।


কিন্তু বাম্পার ফলনের পর দাম পড়ে যাওয়ায় তারা বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ‘রেকর্ড উৎপাদন’ দিয়ে কৃষকের সংসার চলে না। বাম্পার ফলন আশীর্বাদ হওয়ার কথা, কিন্তু সংরক্ষণ ও বাজারব্যবস্থার দুর্বলতায় তা অনেক সময় কৃষকের জন্য লোকসানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। উদ্বৃত্ত ফসল পচে যায় অথবা কৃষক কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন, আবার ভোক্তারাও সব সময় সাশ্রয়ী দামে পণ্য পান না। অর্থাৎ সমস্যা শুধু উৎপাদনে নয়, বড় সমস্যা মাঠ থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত সরবরাহ শৃঙ্খলে।


বাজার, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ, ঋণ, বিমা ও ন্যায্যমূল্যের নিশ্চয়তা ছাড়া কৃষককে বৈচিত্র্যময় ফসলের দিকে যেতে বলা বাস্তবসম্মত নয়। যেখানে উৎপাদন খরচের সঙ্গে যুক্তিসংগত মুনাফা থাকবে। প্রয়োজনে সরকারকে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ফসল কেনার প্রস্তুতিও রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে ডিজিটাল ত্রিমুখী সংগ্রহব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে-যাচাইকৃত কৃষক ডেটা বেইস, ইউনিয়ন পর্যায়ের সংগ্রহকেন্দ্র এবং সরাসরি মোবাইল পেমেন্ট।


এতে মধ্যস্বত্বভোগীর প্রভাব কমবে, স্বচ্ছতা বাড়বে। কৃষকের ঝুঁকি কমাতে কৃষি বিমাও জরুরি। ফসল সংরক্ষণ ব্যবস্থা এখন জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার অপরিহার্য অবকাঠামো। আলু, পেঁয়াজ, টমেটো ও সবজির মতো পচনশীল ফসল মৌসুমে একসঙ্গে বাজারে এলে দাম পড়ে যায়, আবার কয়েক মাস পর ঘাটতি দেখা দেয়। তাই বহুমুখী কোল্ড স্টোরেজ, পেঁয়াজের জন্য বায়ু চলাচলযুক্ত সংরক্ষণাগার, স্থানীয় গুদাম, শুকানোর ব্যবস্থা এবং কৃষক পরিচালিত সংরক্ষণ ইউনিট গড়ে তুলতে হবে।


প্রযুক্তির সহায়তা নিতে হবে, তবে তা ক্ষুদ্র কৃষকের নাগালের মধ্যে রাখতে হবে। মাটি পরীক্ষা, স্যাটেলাইটভিত্তিক ফসল অঞ্চল নির্ধারণ, মোবাইল বাজার বার্তা, আবহাওয়া পূর্বাভাস, ডিজিটাল কৃষিযন্ত্র ভাড়া, ড্রোন ও এআই ভিত্তিক পরামর্শ কৃষিকে আরো স্মার্ট করতে পারে। লক্ষ্য শুধু বেশি উৎপাদন নয়, লক্ষ্য হতে হবে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে উৎপাদন, ন্যায্য দামে বিক্রি, পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা এবং টেকসই কৃষিচর্চা।


আগামী কৃষি বিপ্লবকে শুধু উৎপাদনের পরিমাণে নয়, কৃষকের মর্যাদা, শিশুর পুষ্টি, মাটির স্বাস্থ্য, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং জলবায়ু সহনশীলতার মানদণ্ডে বিচার করতে হবে। বাম্পার ফলন আর কখনোই যেন কৃষকের ট্র্যাজেডি হতে না পারে।