ভূপতির সংসার
নব বধূর শরীরের গন্ধটা খুব লোভনীয়, গন্ধটা শুঁকে শুঁকে দিব্বি কাটানো যায় দু’চার দিন। ভূপতি এই গ্রামের ছেলে বয়স চব্বিশ পঁচিশ বছর হবে। কয়েক বছর থেকেই তার বিয়ের জন্য বউ খোঁজা হচ্ছিল, বউ মিলে তো জাত মিলে না, জাত মিলে তো কুষ্টি মিলে না ভারি মুশকিল এই জাত-পাত মিলানো। হিন্দু ধর্মের রেওয়াজ আছে, জাতে জাত না মিললে, কুলে কুল না মিললে শুধু মুশকিল তা না এ হলো মহামমুশকিল। না মিললে বিয়ে হবে না। শুধুমাত্র এই অজুহাতেই ভূপতির বয়স বেড়েই চলেছে বিন্তু ছাদনা তলায় আর বসা হচ্ছে না। ভূপতি জাতিতে ব্রাহ্মণ, হিন্দু ধর্মের সব চাইতে উঁচু জাত। সে কারণে বউ মিলানো অনেক বেশি কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে।
সে লিখা পড়ায় খুব বেশি দূর এগুতে পারেনি। কোনরকম মেট্রিক পাশ করে তারপরই লিখা পড়ার ইতি টেনে বাপ- দাদার পুরানো ব্যবসা দেখা শোনায় মন দিয়েছে। যদিও লিখা পড়ায় বেশি দূর এগুতে পারেনি কিন্তু বন্ধু-বান্ধব যারা সব উচ্চ শিক্ষিত। সামাজিকতা বজায় ভূপতির গ্রামের সবাই ভ্রাতৃত্ব বজায় রেখে মিলে মিশে থাকার চেষ্টা করে। দুই ভাই আর তিন বোনের মধ্যে পরিবারে ভূপতি সবার ছোট। রংপুর তারাগঞ্জ বাজারে মুদির ব্যবসা আছে ওদের। ওদের বাড়ি কিশোরগঞ্জ উপজেলার কেল্লাবাড়ি নামক গ্রামে। এলাকাটা সম্পূর্ণ হিন্দু অধ্যুষিত বা সম্পূর্ণ মুসলিম এলাকা বললেও ভুল হয় না। সম্প্রদায়িক এমন ভাব আর ভাইচারা ও বসবাসের ধরণ প্রমাণ করে এখানে যেন সবাই সবার আত্মীয়।
আনন্দগুলো যেমন সবাই মিলে ভাগাভাগি করে উপভোগ করে, দুঃখগুলোও তেমনি ভাগাভাগি করে নেয়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর শেষ পর্যন্ত ভূপতির বিয়ের জন্য পাত্রি ঠিক হলো। পাত্রি বগুড়া জেলার কাহালু উপজেলার। পাত্রির নাম নির্মলা, বয়স বিশ-বাইশ বছর হবে আর কি। হিন্দুদের জাত পাত গোত্র বর্ণ বৈষম্যের কারণে ছেলে-মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রেই সংকট দেখা দেয়, ছেলে পাওয়া গেলে মেয়ে পাওয়া যায় না, মেয়ে পাওয়া গেলে ছেলে পাওয়া যায় না। গোত্রে গোত্রে মিল না হলে আবার সমন্ধ হয় না। সমস্যাগুলো সব সময় থাকে। যা-ই হোক বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হলো অগ্রাহায়ণেন তেরো তারিখ রবিবার, বিকেল চারটার সময় বাস যোগে বরযাত্রি রওয়ানা দিবে।
হেমন্ত কাল খুব জাকালো শীত শুরু হয়নি তখনো এর সাথে আছে রাতে ভরা পূর্নিমা, চাঁদের সমস্ত আলোটা এসে শরীরে ঠিকরে পড়ছে। বরযাত্রিরা যে যার মত দামি দামি পোশাক পরে পছন্দমত সাজগোজ করেছে, বরের বোন, বরের ভাবি, পিসতেতো, মাসতুতো ভাই-বোনেরা সুন্দর সুন্দর সুন্দর জামা,জুতো, শাড়ি গহনা পরেছে। কেউ ইচ্ছে খুশি মত সেজেছে হেমন্তের হালকা শীত আর জ্যোৎস্নারাতের সিগ্ধতা সেই সাথে বিয়ের সানাই যেন সব ভেদা ভেদভুলে একাকার করে ফেলেছে। রাত্রি ন’টা নাগাদ কনে-বাড়িতে গাড়ি থামালো। কনে-বাড়ির আত্মীয়-স্বজন, পাড়া প্রতিবেশি বরযাত্রিদের সাদর-সম্ভাষণ জানিয়ে আলিশান ঘরে বসতে দিয়ে মিষ্টিমুখ করালো। রাত্রি দশটা নাগাদ আমাদের খাওয়ার ব্যাবস্থা করা হল।
প্রথম পর্বের খাওয়া শেষ করেই বিয়ের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলো। ঠাকুর পুরোহিত মন্ত্র পাঠ করে বিয়ের আচার-রেওয়াজ যা যা দরকার তা সব শুরু করে দিলেন। ভূপতি মাথায় খুব একটা লম্বা না আবার খাটো বললেও ভুল হয় না। নির্মলা ভূপতির পিছন পিছন হাঁটছে দেখে তাদর উচ্চতা সমান মনে হলেও নির্মলাকে একটু উঁচু দেখাচ্ছে। শরীর স্বাস্থ্য বেশ আঁটসাঁট। কলকাতার জামদানি পড়ে আছে, গলায় অনেক গুলো ভারী মালা, ঠোঁটে লিপিস্টিক, কপালে লালটিপ, সিঁথিতে সিদুর, হালকা হালকা শীত জ্যোৎস্না রাতে চাঁদের
আলোয় বৈদ্যুতি আলোকে আরো বিমোহিত করে ফেলেছে। বাইরে সানাই বাজছে, পুরোহিত মন্ত্র পাঠ করছে, সাত পাকে বাধা হয়ে গেছে এমন সময় বাইরে সোর গোল শোনা যাচ্ছে, কিসের সোর গোল কেউ কেউ কর্ণপাত করলো কেউ কেউ কর্ণ পাত না করেই যার যা কাজ করে যেতে লাগলো, হৈ চৈ আস্তে আস্তে বাড়তে থাকলো, বাড়ির বাইরে গিয়ে যা দেখা গেল তা রীতিমত চোখে অন্ধকার নামার মত, ঐ গ্রামের একটা ছেলে যার নাম নিপেন, সে জাতিতে হিন্দু হলেও বংশের দিক দিয়ে ছোট হওয়ায় তিন বছর আগে তাদের মন দেওয়া নেওয়াকে উপেক্ষা করে ভূপতির সাথে বিয়ে হচ্ছে।
তাই নিপেন কনে বাড়ির সামনে বিষ খেয়েছে। তাকে নিয়েই এতো হৈ চৈ। নিপেন, যার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, চারপাশে মানুষের জটলা। ভূপতি ভেতর থেকে আনেকখানিই আঁচ করতে পারছে। ওদিকে কনে এ খবরে সংজ্ঞাহীন। সানাই থেকে গেছে। দূর আকাশে দেখা গেল একটা পাখির মত কিছু। সবাই বলাবলি করতে লাগলো, ওই যে নিপেন উড়ে যায়।