দৌলতদিয়ায় ফেরিতে বাসডুবি
দুর্ঘটনা রোধে ব্যবস্থাপনার ত্রুটি দূর করা হোক
আবারও দৌলতদিয়ায় ফেরিতে ওঠার সময় একটি যাত্রীবাহী বাস পদ্মা নদীতে পড়ে ডুবে গেল। পূর্ব অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ফলে কোনো প্রাণহানির মত ঘটনা ঘটেনি। এই দৌলতাদিয়া ফেরিঘাটে এ বছরের মার্চে একটি বাস নদীতে পড়ে ডুবে গেলে ২৬ জনের মৃত্যু হয়। এরপর থেকে কর্তৃপক্ষ ফেরিতে বাস ওঠার আগেই যাত্রীদের নেমে যেতে বাধ্য করছিলেন। এই তদারকির ফলও পাওয়া গেছে। ৫ জুন তেমনটিই হয়েছে। কয়েকজন যাত্রী নামতেই চাচ্ছিলেন না।
দুর্ঘটনার পর জীবন পেয়ে তারা সকলেই পূর্ব কৃতকর্মের জন্য নিজেদের ধিক্কার দিচ্ছিলেন। শুক্রবার সকালে ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায় কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী ‘এসবি সুপার ডিলাক্স’ নামের যাত্রীবাহী বাসটি। তবে বাসের চালক ও হেলপার বেচে যান। পরে বাসটিকে উদ্ধারও করা হয়। তবে এই দুর্ঘটনা সারা দেশেই আলোচনায় আসে। প্রাণহানি না হওয়ায় সকলেই স্বস্তি বোধ করেছেন। এর আগে চলতি বছরের মার্চে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহন নামের একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে গেলে ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
বাসডুবির ঘটনায় বাস চালক ও হেলপারের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তারা গ্রেফতারও হন এবং জামিনে মুক্তি লাভ করেন। তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন জমা হলে দুর্ঘটনার বিস্তারিত কারণ জানা সম্ভব হবে।
দেশের ইতিহাসে ফেরি ও নৌ-দুর্ঘটনার বড় বড় ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত এ ধরনের দুর্ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব হয়নি । তাই প্রশ্ন, বারবার ফেরিতে দুর্ঘটনা ঘটছে কেন? নানা পদক্ষেপ নেয়া হলেও কেন বন্ধ করা যাচ্ছে না এই দুর্ঘটনা? ফেরি বা ফেরিঘাটে বাস ও যানবাহন দুর্ঘটনার প্রধান কারণগুলো অনালোচিত কিছু নয়। পরামর্শ আকারে সমাধানের প্রসঙ্গ বারবার এসেছে। কিন্তু এসব ব্যাপারে কোনো ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কে জানা যায় না।
অথচ দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকে। দুর্ঘটনার মূল কারণগুলোর মধ্যে পন্টুনের ত্রুটি, চালকের অসাবধানতা ও তাদের ক্লান্তিবোধ, অতিরিক্ত গতি এবং ঘাট ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা। তবে সচেতনতা বৃদ্ধি ও কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এই ধরনের অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। ৫ জুনের দুর্ঘটনা তার একটি দৃষ্টান্ত বটে। তবে এটাও ঠিক যে যাত্রীদের নামিয়ে দেয়াই সমাধানের একমাত্র পথ নয়। ফেরিঘাটে পন্টুনের অ্যাপ্রোচ রোড বা সংযোগ সড়ক অনেক সময় পিচ্ছিল থাকে, যার ফলে যানবাহন ফেরিতে ওঠার সময় ব্রেক ফেল করে বা নিয়ন্ত্রণ হারায়।
দীর্ঘ পথ গাড়ি চালিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়া চালকরা ফেরিতে ওঠার সময় তাড়াহুড়ো বা ভুল ব্রেক ও গিয়ার ব্যবহারের কারণে নিয়ন্ত্রণ হারান। অনেক সময় মূল চালকের বদলে অনভিজ্ঞ বা লাইসেন্সবিহীন হেলপারদের দিয়ে ফেরিতে গাড়ি ওঠানো হয়, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ফেরি ও ঘাটের দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাব এবং ফেরিতে ওঠার আগে যথাযথ ট্রাফিক সিগন্যাল বা নির্দেশনার অভাব। বৈরী আবহাওয়া ও নদীতে প্রবল স্রোতের কারণে ফেরিগুলো পন্টুনের সাথে ঠিকমতো ভিড়তে পারে না, ফলে যানবাহনকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ওঠানামা করতে হয়।
ফেরিতে গাড়ি ওঠার আগে বা পন্টুনে প্রবেশের আগেই যাত্রীদের অবশ্যই বাস থেকে নামিয়ে দিতে হবে। এতে দুর্ঘটনা ঘটলেও বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়। মোটের ওপর ব্যবস্থাপনাকে ত্রুটিমুক্ত করে যুগপোযোগী করে তোলা এখন সময়ের দাবি।