শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬

১,৭৬,০০০ বছর আগে গুহার ভিতরে গোল করে টন টন পাথর কেটে সাজিয়েছিল আদিমমানব!

সোনার দেশ ডেস্ক ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৬:০৫ অপরাহ্ন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
সোনার দেশ ডেস্ক ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৬:০৫ অপরাহ্ন
১,৭৬,০০০ বছর আগে গুহার ভিতরে গোল করে টন টন পাথর কেটে সাজিয়েছিল আদিমমানব!
ছবি: এআই সহায়তায় তৈরি।

প্রায় ১ লক্ষ ৭৬ হাজার বছর আগের কথা। ততদিনে পৃথিবীতে আধুনিক মানুষের (হোমো সেপিয়েন্স) আবির্ভাব হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তখনও তারা আফ্রিকার বাইরে ছড়িয়ে পড়েনি। সেই সময়ে ফ্রান্সের এক গুহার ভিতরে বৃত্তাকারে সাজানো হয়েছিল পাথরের টুকরো। বিজ্ঞানীদের অনুমান, নিয়ানডারথালেরাই এ সব করেছিল। কিন্তু কেন? তা এখনও রহস্যই রয়ে গিয়েছে।



দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের টার্ন-এ-গারোন প্রদেশে রয়েছে অ্যাভিয়েরন গিরিখাত। এই গিরিখাতেই রয়েছে ব্রুনিকেল গুহা। আদিমানবদের ব্যবহার করা এই গুহা বহু বছর ধরে রয়ে গিয়েছিল লোকচক্ষুর আড়ালে। শেষে ১৯৯০ সালে অভিযাত্রীদের একটি দল এই গুহাটি আবিষ্কার করেন। নুড়িপাথরের একটি ঢাল খুড়ে অভিযাত্রীরা খুঁজে পান গুহার ভিতরে প্রবেশের রাস্তা। সেই পথ ধরে ৩৩৬ মিটার ভিতরে প্রবেশ করে অভিযাত্রীরা এমন কিছুর সন্ধান পান, যার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা আজও পাওয়া যায়নি।


গুহার ওই অংশ ছিল ঘুটঘুটে অন্ধকার। বাইরে থেকে সূর্যের আলো পৌঁছোয় না সেখানে। এমন এক জায়গায় গুহার মেঝেতে সাজানো ছিল টুকরো টুকরো স্ট্যালাগমাইট (চুনাপাথরের গুহায় মেঝে থেকে উপরের দিকে বেড়ে ওঠা এক ধরনের খনিজ শিলা)। পাথর দিয়ে এমন ছ’টি স্তূপ করা ছিল সেখানে। যার মধ্যে দু’টি বৃত্তাকার। একটি বড়, একটি ছোট। বাকি চারটি স্তূপের মধ্যে দু’টি ছিল বড় বৃত্তটির ভিতরে এবং দু’টি ছিল বাইরে।


ফ্রান্সের জাতীয় গবেষণা সংস্থা সিএনআরএস-এর হিসেব অনুযায়ী, অভিযাত্রীদল ওই গুহায় প্রায় ৪০০টি টুকরো পেয়েছিল। যেগুলি ছড়িয়ে ছিল প্রায় ১১২ মিটার জুড়ে। সব মিলিয়ে প্রায় ২.২ টন স্ট্যালাগমাইটের টুকরো জমানো হয়েছিল গুহায়। পাথরগুলি যে কেউ এনে সাজিয়ে রেখেছিলেন, তা গুহার ওই স্তূপগুলি দেখলেই বোঝা যায়। স্তরে স্তরে সাজানো ছিল পাথরগুলি। বড় টুকরোর ফাঁকে গুঁজে রাখা ছিল ছোট ছোট টুকরো। যাতে সেগুলি এক জায়গায় স্থির থাকে। আবার কিছু টুকরো ছিল স্তূপের বাইরের দিকে। সোজা করে দাঁড় করানো ছিল সেগুলি। যেন স্তূপগুলিকে বাইরে থেকে ঠেকনা দিচ্ছে। ওই স্তূপের মধ্যে পোড়া হাড়গোড়ও ছিল।

গত এক দশকে এই স্ট্যালাগমাইটের স্তূপ নিয়ে একাধিক গবেষণা হয়েছে। কিন্তু এগুলি কেন এমন ভাবে সাজানো হয়েছিল, সেই রহস্যের উন্মোচন হয়নি। ২০১৩ সালে ফ্রান্সের বর্দো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী জ্যাক জবারের নেতৃত্বে একদল গবেষক ওই গুহায় যান। তাঁদের লক্ষ্য ছিল ওই পাথরগুলি কত পুরনো, সেই হিসেব কষা। সেগুলিও পরীক্ষা করেন জ্যাক এবং তাঁর সহযোগীরা। গবেষণায় উঠে আসে, পাথরগুলির বয়স প্রায় ১ লক্ষ ৭৬ হাজার ৫০০ বছর (প্রকৃত বয়স গবেষণালব্ধ হিসেবের চেয়ে ২১০০ বছর কমবেশি হতে পারে)।


২০১৬ সালে এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয় ‘নেচার’ জার্নালে। এই বয়স আবিষ্কারটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এর থেকে বোঝা যায় বৃত্তাকার স্তূপগুলি কোনও আধুনিক মানুষ তৈরি করেনি। ওই সময়ে ফ্রান্স তো দূর, ইউরোপের কোথাওই আধুনিক মানুষ ছিল না। যা ইঙ্গিত দেয়, নিয়ানডারথালেরাই ওই স্তূপগুলি বানিয়েছিল।


গুহামুখ থেকে এতটা ভিতরে পাথরগুলিকে সাজানোর জন্য নিশ্চয়ই সময়ও লেগেছিল যথেষ্ট। কিন্তু এতটা ভিতরে সূর্যের আলো প্রবেশের উপায় ছিল না। যা থেকে বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন, আগুন জ্বালিয়ে রেখে গুহার ভিতরটি আলোকিত করা হত। কালচে হয়ে যাওয়া হাড়গোড়ও তেমনটাই ইঙ্গিত করে। যে ছ’টি স্তূপ রয়েছে গুহার মধ্যে, সবগুলিতেই এমন হাড়গোড়ের নমুনা রয়েছে। তার সঙ্গে স্ট্যালাগমাইটগুলির মধ্যেও ৫৭টি লালচে এবং ৬৬টি কালচে হয়ে গিয়েছিল। গুহার ছাদ থেকে জল চুঁইয়ে পড়ে এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। কারণ ছাদের দিকে এমন কোনও চিহ্ন মেলেনি।


পরবর্তী সময়ে অপর এক গবেষণায় পাথরগুলিকে রমন স্পেকট্রোমেট্রি (লেজ়ার আলোর সাহায্যে রাসায়নিক বিশ্লেষণের এক বিশেষ প্রক্রিয়া। সিভি রমনের নামানুসারে এই নামকরণটি করা হয়) পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করা হয়। তাতে দেখা যায়, হাড়ের টুকরোগুলি নিয়ন্ত্রিত ভাবে পোড়ানো হয়েছিল। জীবাশ্মবিদ জন হকসের মতে, পাথরের গায়েই নির্দিষ্ট স্থানে এই আগুনগুলি ধরানো হয়েছিল।


গুহাটির আরও একটি রহস্যের উন্মোচন হয়েছে। ১৯৯০ সালের অভিযাত্রীদল যে পথ দিয়ে গুহায় প্রবেশ করেছিল, আদিমানবেরা সেই পথটি ব্যবহার করত না। কারণ অভিযাত্রীরা যে পথে প্রবেশ করেছিলেন, তা ছিল খুবই সঙ্কীর্ণ। হেলমেট মাথায় দিয়ে, দড়ি ধরে ধরে সেখানে পৌঁছোতে হয়েছিল অভিযাত্রীদের। ফলে আদিমানবেরা যে এই পথ ব্যবহার করত না, তা স্পষ্ট। তা হলে কোথা দিয়ে গুহায় প্রবেশ করত তারা? তা নিয়েও পৃথক একটি পরীক্ষানিরীক্ষা চালান বর্দো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিরূপবিদ্যার গবেষক কিম জেনুইট। এ বছরে ‘কোয়াটারনারি সায়েন্স রিভিউস’ জার্নালে তাঁর গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে।


তাতে দেখা যাচ্ছে গুহার মূল প্রবেশপথটির উচ্চতা ছিল দুই মিটারেরও কম। কিন্তু ভূমিধসের কারণে ওই গুহামুখটি বন্ধ হয়ে যায়। কিম এবং তাঁর সহযোগীদের অনুমান, ১ লক্ষ ৪২ হাজার ৯০০ বছর (প্রকৃত সময় ১,৩০০ বছর কমবেশি হতে পারে) আগে কোনও এক ভূমিধসের জেরে ওই পথটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফলে গুহার ভিতরের ওই বৃত্তাকার স্তূপগুলি একই রকম অবস্থায় রয়ে যায়।


কিন্তু এটি বৃত্তাকার স্তূপগুলি কেন তৈরি করা হয়েছিল, তার কোনও ব্যাখ্যা মেলেনি। গুহার ভিতরে এমন কিছু মেলেনি যা ইঙ্গিত দিতে পারে সেখানে আদিমানবের বাস ছিল। কোনও পাথরের সরঞ্জাম মেলেনি। নিয়ানডারথাল বা কোনও হোমিনিনের হাড়ও মেলেনি। মেঝে বসবাসের উপযোগী ছিল কি না, তা-ও স্পষ্ট নয়। মেলেনি কোনও ধ্বংসাবশেষ। সাজানো স্তূপ এবং তার মধ্যে কিছু পোড়া দাগ ছাড়া কিছুই মেলেনি গুহায়। যেন, কেউ গুহার ভিতরে ঢুকে পাথরগুলো সাজিয়েছিল, আগুন ধরিয়েছিল, তার পরে একটিও টুকরো মেঝেতে না ফেলে চলে গিয়েছিল।


গুহার মধ্যে এগুলি কেন তৈরি করা হয়েছিল, তা নিয়ে কিছু তত্ত্ব রয়েছে। কেউ মনে করেন শীতের সময়ে আশ্রয় নেওয়ার জন্য এই গুহাটি ব্যবহার হত। কেউ মনে করেন আচার-অনুষ্ঠান পালনের জায়গা। কিন্তু এগুলি সবই অনুমানের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া কিছু তত্ত্ব। এর কোনও প্রমাণ্য তথ্য কোথাও পাওয়া যায়নি।


তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার অনলাইন