শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬

নিয়ামতপুরে আত্মহত্যার প্রবণতা উদ্বেগজনক ৮ মাসে আত্মহত্যার চেষ্টা ২০০ জনের, প্রাণ গেছে ২৯ জনের

সিরাজুল ইসলাম, নিয়ামতপুর ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:১০ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
সিরাজুল ইসলাম, নিয়ামতপুর ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:১০ অপরাহ্ন
নিয়ামতপুরে আত্মহত্যার প্রবণতা উদ্বেগজনক  ৮ মাসে আত্মহত্যার চেষ্টা ২০০ জনের, প্রাণ গেছে ২৯ জনের

নওগাঁর নিয়ামতপুরে আত্মহত্যার প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আত্মহত্যার চেষ্টা করে অন্তত ২০০ জন চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৯৪ জনই কীটনাশক পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। একই সময়ে আত্মহত্যার ঘটনায় ২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে।


উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, কৃষিপ্রধান এলাকা হওয়ায় নিয়ামতপুরে কৃষিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক সহজলভ্য। দোকান থেকে সহজেই এসব কীটনাশক কেনার সুযোগ থাকায় আত্মহত্যার চেষ্টায় কীটনাশক পানের ঘটনা বেশি ঘটছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আত্মহত্যার চেষ্টায় চিকিৎসা নেওয়া ২০০ জনের মধ্যে জানুয়ারিতে ১০, ফেব্রুয়ারিতে ১৭, মার্চে ২৮, এপ্রিলে ৩১, মে মাসে ২৯, জুনে ৩২, জুলাইয়ে ২৪ এবং আগস্টে ২৯ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।


আত্মহত্যার চেষ্টা করা ব্যক্তিদের মধ্যে বয়ঃসন্ধিকালের তরুণ-তরুণীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। এ ছাড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের লোকজনও রয়েছেন। তাঁদের বেশির ভাগের বয়স ১৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।


স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতিরিক্ত আবেগপ্রবণতা, সহিষ্ণুতার অভাব, পারিবারিক কলহ, সাংসারিক মনোমালিন্য, মানসিক চাপ, হতাশা, মোবাইল ও ডিজিটাল ডিভাইসে অতিরিক্ত আসক্তি, অপরিণত প্রেমের সম্পর্ক, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক সংকটসহ নানা কারণে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে।

কীটনাশক পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করা উপজেলা সদর ইউনিয়নের ২০ বছর বয়সী এক তরুণ (ছদ্মনাম সবুজ) বলেন, পারিবারিক কলহ থেকে মুক্তি পেতে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন।

একই ইউনিয়নের এক গৃহবধূ বলেন, অল্প বয়সে বিয়ের পর থেকেই স্বামীর সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রায়ই ঝগড়া হতো। সেই যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে তিনি আত্মহত্যার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।


গত ২২ জুলাই উপজেলার পাঁড়ইল ইউনিয়নের পশ্চিম মীরাপাড়া এলাকায় স্বামীর ওপর অভিমান করে দেড় বছরের একমাত্র সন্তানকে হত্যার পর নিজেও আত্মহত্যার চেষ্টা করেন এক মা। পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে তিনি বেঁচে যান।


ওই নারী বলেন, “একমাত্র সন্তানকে বিষ খাইয়ে মেরে নিজেও বিষপান করেছি। অশান্তি থেকে বাঁচতেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।”

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফয়সাল নাহিদ বলেন, দিন দিন মানুষের ধৈর্য ও সহনশীলতা কমে আসছে। ছোটখাটো বিষয়কে কেন্দ্র করেও অনেকে আত্মহত্যার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করছেন না। জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ১৯৪ জন কীটনাশক পান করে হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসা শেষে তাঁরা বাড়ি ফিরেছেন। আত্মহত্যা প্রতিরোধে সরকারি উদ্যোগে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।


নিয়ামতপুর সরকারি কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক ওবাইদুল হক চৌধুরী বলেন, স্মার্টফোনের অপব্যবহার, মাদকাসক্তি, নৈতিক শিক্ষার অভাব ও মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে অজ্ঞতাসহ বিভিন্ন কারণে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার চেষ্টা করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ প্রবণতা প্রতিরোধে অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার পাশাপাশি পারিবারিক বন্ধন আরও জোরদার করা প্রয়োজন।


উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুর্শিদা খাতুন বলেন, নিয়ামতপুরে উদ্বেগজনকভাবে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সমাজে এর প্রভাব কমাতে পারিবারিক শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই।#