ভুল করে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে, ১১ দিন পর স্বজনদের কাছে পাঁচ বাংলাদেশি
ছেলের ফেরার অপেক্ষায় ১১টি দিন কেটেছে গোলাম মোস্তফার। প্রতিদিনই তাঁর মনে হয়েছে, এই বুঝি ছেলে মোশাররফ ফিরে আসবে। কিন্তু দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হয়েছে, বেড়েছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। অবশেষে শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় পদ্মার তীরে ছেলেকে ফিরে পেয়ে সেই অপেক্ষার অবসান হলো তাঁর।
শুধু গোলাম মোস্তফা নন, ১১ দিন পর স্বজনদের ফিরে পেয়ে স্বস্তি ফিরেছে রাজশাহীর বাঘার পাঁচ পরিবারের। গত ৭ সেপ্টেম্বর রাতে পাট কিনে নৌকায় করে বাঘায় ফেরার পথে ভুল করে ভারতের সীমান্তে ঢুকে পড়েছিলেন ওই পাঁচ বাংলাদেশি। তাঁদের পাটবোঝাই নৌকাসহ আটক করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। ১১ দিন পর শুক্রবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে ভারতের সাগরপাড়া সীমান্তের বিএসএফ ক্যাম্প থেকে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে আলাইপুর বিজিবি ক্যাম্পের মাধ্যমে তাঁরা বাংলাদেশে ফেরেন।
ফিরে আসা পাঁচজন হলেন বাঘা উপজেলার পাকুড়িয়া ইউনিয়নের আলাইপুর মধ্যপাড়া গ্রামের গোলাম মোস্তফার ছেলে কলেজছাত্র মোশাররফ হোসেন (২২), ইউনুস মণ্ডলের ছেলে শাহাবুল আলী (৪২), শাজাহান আলীর ছেলে বাবর আলী (৪৫), নৌকার মাঝি জামাল হোসেনের ছেলে আসাদুল ইসলাম (৪১) ও সামাদ আলীর ছেলে সাইফুল ইসলাম (৫৮)।
আলাইপুর বিজিবি ক্যাম্পসংলগ্ন পদ্মা নদীর তীরে তাঁদের স্বজনদের কাছে গ্রহণ করেন রাজশাহী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদ। পরে তাঁদের স্বজনদের কাছে তুলে দেওয়া হয়। এ বিষয়ে বিএসএফের হাত থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত মোশারফ হোসেনের পিতা গোলাম মোস্তফা বলেন, এমপি ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনারের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এর আগে তিনি ফিরে আনার ব্যপারে আশ্বাস দিয়েছেন। ছেলেকে কাছে পেয়ে গোলাম মোস্তফা বলেন, “১১ দিন ধরে ছেলেকে কাছে না পেয়ে আমরা খুব দুশ্চিন্তায় ছিলাম। প্রতিটি দিন তাঁর ফেরার অপেক্ষায় কেটেছে। আজ ছেলেকে সুস্থভাবে ফিরে পেয়েছি, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় স্বস্তি।”
বাবর আলীর স্ত্রী হেলেনা বেগম বলেন, “এই ১১ দিন স্বামীকে ছাড়া খুব দুশ্চিন্তায় কাটাতে হয়েছে। প্রতিদিন তাঁর ফেরার অপেক্ষায় ছিলাম। আজ তাঁকে সুস্থভাবে ফিরে পেয়ে পরিবারের স্বস্তি ফিরে এসেছে।”
এ বিষয়ে বিএসএফের হাত থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত মোশারফ হোসেনের পিতা গোলাম মোস্তফা বলেন, এমপি ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনারের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এর আগে তিনি ফিওে আনার ব্যপারে আশ্বাস দিয়েছেন।
এদিকে মুক্তিপ্রাপ্ত আসাদুল ইসলামের ভাই সাহারুল ইসলাম বলেন, আমার ভাইসহ ৫ জনকে ভারতের রানীনগর থানায় ছিল। ১১ দিন সেখানে থাকার পর মুক্তি পেয়ে আমাদের কাছ এসেছেন।
স্বজন ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ৭ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে আটটার দিকে কুষ্টিয়ার বাংলাবাজার চর থেকে পাট কিনে নৌকায় বাঘায় ফেরার সময় পদ্মা নদীর তীব্র স্রোতে দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েন তাঁরা। একপর্যায়ে নৌকাটি ভুল করে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের প্রায় দুই থেকে আড়াই কিলোমিটার অভ্যন্তরে চলে যায়। সেখানে বিএসএফের একটি টহল দল তাঁদের আটক করে। আটকের পর পরিবারের সদস্যরা আলাইপুর বিজিবি ক্যাম্পে যোগাযোগ করেন। পরে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক হয়।
বৈঠকে বিএসএফের পক্ষ থেকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া তাঁদের ফেরত দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানানো হয়। পাঁচ বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনতে এরপর উদ্যোগ নেন সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদ। তিনি রাজশাহীতে নিযুক্ত ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার মনোজ কুমারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাঁদের ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
আলাইপুর বিওপি ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার নায়েক সুবেদার মাকসুদুর রহমান বলেন, “বিএসএফের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাঁদের মুক্ত করে আমাদের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।” আসাদুল ইসলামের ভাই সাহারুল ইসলাম বলেন, “আমার ভাইসহ পাঁচজনকে ভারতের রানীনগর থানায় রাখা হয়েছিল। ১১ দিন পর তাঁরা মুক্তি পেয়ে আমাদের কাছে ফিরে এসেছেন।”
পাঁচজনকে স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের সময় আবু সাইদ চাঁদ বলেন, “নদীর স্রোতের কারণে ভুলবশত তারা বিএসএফের হাতে আটক হওয়ার পর থেকে আমি কখনও ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনারের কার্যালয়ে, কখনও বিজিবির সিওর সঙ্গে, আবার কখনও জেলা প্রশাসকের দপ্তরে যোগাযোগ করেছি। আমার এলাকার প্রতিটি নাগরিক আমার কাছে নিজ সন্তানের মতো আপন। তাদের পরিবারের কাছে নিরাপদে ফিরিয়ে দিতে পেরে আমি খুশি।” তিনি আরও বলেন, “ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনারের সঙ্গে কথা বলেছি। জাতীয় পরিচয়পত্র ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন জমা দেওয়ার পর তাঁদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। অবশেষে ১১ দিন পর প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় তাঁদের মুক্ত করে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।”
১১ দিন পর প্রিয়জনদের ফিরে পাওয়ার মুহূর্তে আলাইপুরের পদ্মাতীরে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়। দীর্ঘ উৎকণ্ঠার পর স্বজনদের কাছে ফিরে পাঁচ বাংলাদেশির পরিবারের সদস্যদের মুখে ফুটে ওঠে স্বস্তির ছাপ।