সৌদি আরবের অনুরোধেও হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাবে না ইসরায়েল
হুথি বিদ্রোহীদের হামলা মোকাবিলায় সৌদি আরব ইসরায়েলের কাছে সহায়তা চাইলেও আপাতত ইয়েমেনের এই ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অভিযানে জড়ানোর পরিকল্পনা নেই ইসরায়েলের। দেশটির এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা আল-মনিটরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে ইসরায়েল তার অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে। তবে আপাতত হুথিদের মোকাবিলায় একটি আঞ্চলিক জোট গঠনের ওপর জোর দিচ্ছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ হলো হুথিদের ক্রমবর্ধমান সামরিক সক্ষমতা। ইয়েমেন ও সৌদি আরবের যৌথ প্রতিরোধব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার পাশাপাশি একাধিকবার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরও হুথিদের সক্ষমতা বাড়ছে বলে দাবি করেছেন ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তারা।
সম্প্রতি লোহিত সাগরের গ্রেটার হানিশ ও লেসার হানিশ দ্বীপ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করেছে হুথিরা। এর আগে তারা বন্দরনগরী মোখা ও মায়ুন দ্বীপ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার কথাও জানিয়েছে। এসব অবস্থানের কারণে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশে তাদের প্রভাব বাড়ছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
এক ইসরায়েলি নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, ইসরায়েলি ও মার্কিন বিমান হামলায় হুথিরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়লেও তাদের সামরিক ও গোয়েন্দা সক্ষমতা কমেনি। বরং সাম্প্রতিক হামলাগুলোতে হুথিদের স্থল ও গোয়েন্দা সক্ষমতার উন্নতির প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ইসরায়েলি গোয়েন্দা সূত্রের মতে, তিনটি পরিস্থিতিতে হুথিদের বিষয়ে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর বর্তমান অবস্থান পরিবর্তিত হতে পারে।
প্রথমত, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা বেড়ে গেলে। এমন পরিস্থিতিতে ইরান হুথিদের মাধ্যমে ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার নির্দেশ দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছে ইসরায়েল। সে ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক পাল্টা জবাব দেওয়ার কথা জানিয়েছে দেশটি।
ওই ইসরায়েলি গোয়েন্দা সূত্র বলেন, আপাতত হুথিদের বিরুদ্ধে নতুন কোনো অভিযানে যোগ দেওয়া বা তাদের ওপর হামলা চালানোর ইচ্ছা ইসরায়েলের নেই। তবে হুথিদের ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠ প্রক্সি শক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে ইসরায়েল।
দ্বিতীয়ত, বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর হুথিদের নিয়ন্ত্রণ আরো জোরদার হলে। ইসরায়েলি এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকের মতে, এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নৌ চলাচলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী এইলাতের কার্যক্রম ব্যাহত হলে ইসরায়েলকে সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করতে হতে পারে বলে ওই কূটনীতিক মন্তব্য করেন।
তিনি আরো বলেন, হুথিরা প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে ট্রানজিট ফি আদায়ের চেষ্টা করলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তৃতীয়ত, হুথিদের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার প্রচেষ্টায় সৌদি আরব ইসরায়েলকে সরাসরি যুক্ত করার চেষ্টা করলে। মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে ইসরায়েলি চ্যানেল ১২ জানিয়েছে, সৌদি আরবকে গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের তত্ত্বাবধানে ইসরায়েল ও সৌদি আরবের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে হুথিদের সম্পর্কে ইসরায়েলের মূল্যায়নে বড় পরিবর্তন এসেছে। একসময় তুলনামূলক দুর্বল ও অদক্ষ মিলিশিয়া হিসেবে বিবেচিত হলেও বর্তমানে হুথিরা নিজেদের উল্লেখযোগ্য সামরিক সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েল ইরান-সমর্থিত হামাস ও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক অভিযান চালিয়েছে। এর পাশাপাশি হুথিদের বিরুদ্ধেও ইসরায়েল দূরপাল্লার হামলা চালিয়েছে। তবে ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দাবি, এসব হামলার পরও হুথিদের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে অক্ষুণ্ন রয়েছে।
এক ইসরায়েলি রাজনৈতিক সূত্র আল-মনিটরকে বলেন, হুথিরা এখন একটি স্থানীয় কৌশলগত সমস্যা থেকে বৈশ্বিক কৌশলগত সমস্যায় পরিণত হচ্ছে। তাদের কর্মকাণ্ডের প্রভাব পুরো মধ্যপ্রাচ্যে পড়তে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ওই সূত্রের মতে, হুথিদের তৎপরতা সৌদি আরব ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশকে ইসরায়েলের আরো কাছে নিয়ে আসতে পারে এবং দেশগুলোকে ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা ও গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভরশীল করে তুলতে পারে। আবার এর বিপরীত পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
হুথিদের তৎপরতার কারণে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পথ বেছে নিতে পারে এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক শীতল করতে পারে— এমন সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেছেন ওই কর্মকর্তা। তার মতে, এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নীতিগত অবস্থানের ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করবে।
তথ্যসূত্র: আল-মনিটর, রাইজিংবিডি