শনিবার, আগস্ট ২২, ২০২৬

চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মায় ভাঙন: ৭৫১ কোটি টাকার বাঁধ প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায়

WP Import ০৮ নভেম্বর ২০২৫ ১১:৫২ অপরাহ্ন
WP Import ০৮ নভেম্বর ২০২৫ ১১:৫২ অপরাহ্ন
চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মায় ভাঙন: ৭৫১ কোটি টাকার বাঁধ প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায়
চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মায় ভাঙন: ৭৫১ কোটি টাকার বাঁধ প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায়

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি:


ভারতের গঙ্গা বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রবেশ করে হয়েছে পদ্মা নদী। প্রতিবছর বর্ষা এলেই ভারত অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিতে খুলে দেয় ফারাক্কা বাঁধের বেশিরভাগ গেইট। আর এতেই পানির তীব্র স্রোতে নদী ভাঙনের কবলে পড়ে বসতবাড়ি ও ফসলি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ ও সদর উপজেলার নদী পাড়ের বাসিন্দারা। প্রত্যেক বছর নদীগর্ভে বিলীন হয় মসজিদ, মাদ্রাসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি স্থাপনাসহ হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি।

পদ্মা তীরবর্তী স্থানীয় বাসিন্দা ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, ফারাক্কা বাঁধের কারণে বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে নদী ভাঙন দেখা যায় পদ্মা নদীতে। বিলীন হয়ে গেছে পাকা, নারায়নপুর, দুর্লভপুর ইউনিয়নের বেশিরভাগ এলাকা। এছাড়া বর্ষায় অতিরিক্ত পানিতে ফসলি জমি ও বসতবাড়ি তলিয়ে যায়। অন্যদিকে, শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদী পরিণত হয় মরুভূমিতে। এমন অবস্থায় নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণের দাবি নদী পাড়ের বাসিন্দাদের।
ভারত থেকে বয়ে আসা পদ্মা নদীতে ফারাক্কার ভাটিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রায় ৯ কিলোমিটার নদী ভাঙন কবলিত এলাকা রক্ষায় নেয়া হচ্ছে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের প্রকল্প। প্রাথমিকভাবে এতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭৫১ কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে রক্ষা পাবে নদী তীরবর্তী শিবগঞ্জ ও সদর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বসতবাড়ি ও ফসলি জমি। আগামী বর্ষা মৌসুমের আগেই কাজ শুরুর দাবি স্থানীয়দের।

তাদের দাবি, দ্রুত কাজ শেষ হলে ভাঙন থেকে রক্ষা পাবে দুই উপজেলার কয়েক হাজার বাসিন্দার বসতবাড়ি।
শিবগঞ্জ উপজেলার বোগলাউড়ি ঘাট এলাকার আলামিন হোসেন বলেন, ‘গত ৩০ বছরে ৯ বার ভাঙনের শিকার হয়ে পদ্মার চর থেকে এপারে বসতি স্থাপন করেছি। তবুও কোনো নিস্তার নেই। আবারও বাড়ির কাছে চলে এসেছে নদী। যেকোনো মুহূর্তে নদী ভাঙনের শিকার হয়ে সবকিছু হারাতে পারি। এবার ভাঙনের শিকার হলে সবকিছু শেষ হয়ে যাবে। আর কিছুই বাকি থাকবে না।’
৫০ বছরের জীবনে নদী ভাঙনের শিকার হয়ে সীমান্তবর্তী হাসানপুর গ্রামের বাসিন্দা আমজাদ হোসেন ৮ বার বাড়ি ভেঙেছেন।

তিনি বলেন, ‘আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। চরে বসবাস করতে করতে আর বাড়ি ভাঙতে ভাঙতে সব শেষ হয়েছে। পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া ২৫ বিঘা জমির এক ছটাকও আর নেই। সবই এখন নদীর মধ্যে। উপায় না পেয়ে অন্য মানুষের আশ্রয়ে আমবাগানে আশ্রয় নিয়েছি। আমাদের সবকিছুর বিনিময়ে হলেও একটা বাঁধ চাই। কারণ বাঁধ ছাড়া আর রক্ষা নেই আমাদের।’
বোগলাউড়ি ঘাট এলাকার বাসিন্দা তারেক আলী বলেন, ‘যখনই কোনো নেতা বা প্রশাসনের লোক নদী ভাঙন পরিদর্শন করতে আসে, তখনই একটু ভরসা পায়, এই বুঝি এবার নদী রক্ষা বাঁধ হবে। আমাদের শত বছরের ভোগান্তি দূর হবে। কিন্তু তা আর হয় না। কারণ তারা নিজেদের স্বার্থে ভোট নিতে বা চাকরির সুবাদেই তামাশা দেখাতে আসেন। আমাদেরও আর কোসো ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না। প্রধান উপদেষ্টার কাছে আকুল আবেদন, আমাদের ভারতীয় ফারাক্কা বাঁধের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করুন। আমাদের বিকল্প কোনো পথ নেই।’

যুবক আলামিন আলী বলেন, ‘প্রত্যেক বছর বন্যার পানি বাড়লে বা কমলে ভাঙন দেখা যায়। নামোজগনাথপুর এলাকায় এবার প্রায় ১০০ কবর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। যারমধ্যে আমার পরিবারেরই রয়েছে চারটি। ঘরবাড়ি ফসলি জমি হারালেও আবার ফিরে পাবার বা নতুন করে করার সুযোগ আছে। কিন্তু পূর্বসূরিদের শেষ ঠিকানার উপর যে আঘাত এবং বিলীন হয়ে যাওয়ার ঘটনা, তা কতোটা বেদনাদায়ক তা কাউকে বলে বুঝানো সম্ভব নয়। আমাদের এই যন্ত্রণা দেখার কেউ নেই।’

স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, বাঁধ নির্মাণের প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে নেয়া হচ্ছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।
শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আজাহার আলী বলেন, আমরা দফায় দফায় নদী ভাঙন কবলিত এলাকা ঘুরে দেখেছি ও ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। তাদের এই দাবি যৌক্তিক। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছি, যাতে দ্রুত সময়ের মধ্যে নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করে তাদেরকে রক্ষা করেন। এ নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, বর্তমানে নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য ৭৫১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে রয়েছে। অতিরিক্ত ভাঙন কবলিত এলাকাগুলো এই প্রকল্পের আওতায় রাখা হয়েছে।
চাঁপাইবাবগঞ্জ জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম আহসান হাবীব জানান, ভারতীয় ফারাক্কা বাঁধের ভাটিতে ভাঙনের শিকার হয়ে চরম ভোগান্তি ও কষ্টে রয়েছে। বিষয়টি বিবেচনায় নিতে আমরা একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছি। আশা করি, তা দ্রুত অনুমোদন পেলে ভাঙন রোধ করা সম্ভব হবে।