রাজশাহীর বাতাসে বাড়ছে দূষণের মাত্রা

ফাইল ছবি
নিজস্ব প্রতিবেদক:
বয়ে যাওয়া প্রমত্তা পদ্মাপারের গড়ে ওঠা বিভাগীয় শহর রাজশাহী। একসময় সবুজ আর স্নিগ্ধ বাতাসে সুস্থ থাকত প্রাণ ও প্রকৃতি। কিন্তু দিন দিন মলিন হচ্ছে পরিবেশ। ধুলাবালির আস্তরণে ঢাকা পড়েছে নগরীর খ্যাতি। ক্লিন সিটির তকমা হারিয়ে রাজশাহী এখন ‘ধুলার নগরী’। মাঝেমধ্যেই সারাদেশের মধ্যে রাজশাহীর বাতাসেও দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
জানা গেছে, নির্মল বাতাসের জন্য ২০১৬ সালের এক জরিপে বিশ্বসেরা শহরের তালিকার শীর্ষে নাম উঠেছিল রাজশাহীর। নগরীজুড়ে সবুজায়ন, জিরো সয়েল প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং জ্বালানিচালিত যানবাহনের সংখ্যা কম থাকায় বায়ুদূষণ ছিল না বললেই চলে।
এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স বা বায়ুর গুণমান সূচক (একিউআই) ৫০-এর সীমা পর্যন্ত সাধারণত নিরাপদ বলে বিবেচিত হয়। তবে একিউআইয়ের মান ১০০ অতিক্রম করলে বায়ু ক্রমশ ক্ষতিকারক হয়ে উঠতে থাকে। একিউআইয়ের মান ২০০ অতিক্রম হলে সেই বায়ুকে অস্বাস্থ্যকর এবং ৩০০-এর ওপরে হলে বিপজ্জনক বলে বিবেচিত হয়।
পরিবেশ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, এমতাবস্থায় জনসাধারণকে ঘরের বাইরে অবস্থানকালে মাস্ক পরিধান করা এবং সংবেদনশীল ব্যক্তিদের জরুরি প্রয়োজন ব্যতীত ঘরের বাইরে অবস্থান না করার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার বায়ুদূষণের অবস্থা নিয়মিত তুলে ধরে। বাতাসের মান নিয়ে তৈরি করা এই লাইভ বা তাৎক্ষণিক সূচক একটি নির্দিষ্ট শহরের বাতাস কতটা নির্মল বা দূষিত, সেই সম্পর্কে মানুষকে তথ্য দেয় ও সতর্ক করে। শনিবার দুপুরে একিউআইয়ের তথ্যমতে রাজশাহীতে বায়ুর মান ছিল ১৫৫। আর রাত আটটায় ছিল ১১৭।
রাজশাহী পরিবেশ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক কবির হোসেন বলেন, শুষ্ক মৌসুমে যে বায়ুদূষণ হয়, এর প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ ভাগ হয় ট্রান্সবাউন্ডারি থেকে, যা ভারতের মালদা ও মুর্শিদাবাদ থেকে হচ্ছে। সেখানকার দূষিত বাতাস এসে রাজশাহীকে প্রভাবিত করছে। বাকি যে ৬৫ শতাংশ দূষণ তার মূল উৎসগুলো কমিয়ে আনার চেষ্টা করছে সরকারÑ যে জন্য বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা-২০২২ জারি করা হয়েছে। বিধিমালার বাস্তবায়ন জরুরি।
বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০২২ সালে জারি করা হয়েছে। এই বিধিমালাটি বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এর অধীনে প্রণীত। এবং কার্যকর হওয়ার সাথে সাথেই বলবৎ হয়েছে। বিধিমালা অনুযায়ী, বায়ু দূষণ সংক্রান্ত অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদ- বা দুই লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ড হতে পারে।
এদিকে রাজশাহী নগরী ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন স্থানে চলছে কংক্রিটের কাজ। সড়কের ওপর যেখানে-সেখানে পড়ে আছে নির্মাণসামগ্রী। নগরীর রেলগেট ও বন্ধগেট এলাকায় চলছে ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ। সেখানকার দোকানদাররা বলছেন, ধুলাবালির কারণে তাদের ব্যবসা বন্ধের উপক্রম। ক্রেতা পাওয়া যায় না। ধুলাবালিতে দোকানের মালামাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এমনকি ওই এলাকার মার্কেটগুলোতে কেউ দোকান ভাড়া নিতেও চান না।
শনিবার (২৫ অক্টোবর) সকালে বরেন্দ্র পরিবেশ উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার পক্ষ থেকে পরিচালিত এক
চেতনতামূলক প্রচারণা ও গবেষণায় এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে আসে। প্রকৌশলী মো. জাকির হোসেন খানের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালের শুষ্ক মৌসুমের ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ অন্তর্ভুক্ত। রেলগেট মোড়ে পি.এম ২.৫ এর মাত্রা ছিল ৮৫ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার, পি.এম ১০ এর মাত্রা ৯৭। বন্ধগেট এলাকায় যথাক্রমে ৭৮ এবং ৯১ মাইক্রোগ্রাম। বিসিক এলাকায় পি.এম ২.৫ ও পি.এম ১০ ছিল যথাক্রমে ৫৭ এবং ৬৯ মাইক্রোগ্রাম।

বাংলাদেশে ২৪ ঘণ্টার জন্য পি.এম ২.৫ এর সহনীয় মাত্রা ৬৫ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার এবং পি.এম ১০ এর জন্য ১৫০ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার। ফলাফল অনুযায়ী, রেলগেট ও বন্ধগেট এলাকায় পি.এম ২.৫ জাতীয় মানের চেয়ে অনেক বেশি, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক।
২০২২ সালে সর্বোচ্চ গড় পি.এম ২.৫ ছিল ৭৬, ২০২৩ সালে ৯৭ এবং ২০২৪ সালে বেড়ে ১২৫ মাইক্রোগ্রাম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পি.এম ২.৫ সরাসরি ফুসফুস ও রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করতে পারে, ফলে ফুসফুস ও হৃৎপি-ের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। পি.এম ১০ কণার কারণে চোখ, নাক ও গলায় অস্বস্তি হয়।
গবেষকরা বায়ু দূষণের মূল কারণ হিসেবে অপরিকল্পিত নগরায়ন, গাছ কাটা, পুকুর ভরাট ও নির্মাণ কাজের সময় বায়ু দূষণ বিধি ২০২২ না মেনে চলাকে দায়ী করেছেন। ২০২৩ সালের বিশ্বব্যাংক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের যৌথ গবেষণাতেও ঢাকা ও রাজশাহীর বায়ু দূষণের জন্য একই কারণগুলো দায়ী করা হয়েছিল।
গবেষকদের মতে, সজনে গাছ সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণে অত্যন্ত কার্যকরী। এছাড়াও অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে বায়ু দূষণ বিধি ২০২২ কঠোরভাবে মেনে চলা, নগরীর পুকুর ভরাট বন্ধ করা এবং অবৈধভাবে দখল হওয়া পুকুরগুলো উদ্ধার করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। একই সাথে একটি গাছ কাটার পরিবর্তে অন্তত তিনটি নতুন গাছ লাগানোর নিয়ম বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা হয়েছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. গোলাম মোস্তফা বলেন, স্থাপনা নির্মাণে পরিবেশ রক্ষায় আইন তো মানাই হচ্ছে না। তা ছাড়া রাজশাহীতে গেল ১০ বছরে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যাও বেড়েছে কয়েক গুণ। এর বাইরে আছে ডিজেলচালিত বাস-ট্রাকসহ কালো ধোয়া নির্গমনকারী গাড়ি। কিন্তু বিআরটিএ এগুলো দেখে না। ফলে অনিবার্যভাবেই রাজশাহী নগরীর বায়ুতে দূষণ বাড়ছেই।
এদিকে রাজশাহী সিটি করপোরেশন আইকিউএয়ারের তথ্য নাকচ করে দিয়েছে। তাদের দাবি, বায়ুদূষণ রোধে নানা ধরনের কার্যক্রম চলছে। তবে নগরীর বায়ুর মান নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা প্রয়োজন। সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাধায়ক প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) আহমদ আল মইন বলেন, আমরা মনে করি রাজশাহী নগরীর বাতাসের মান ঠিক আছে। তবে উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান থাকলে কিছু সমস্যা হয়, এটি স্বাভাবিক। আমরা ঠিকাদারদের বলেছি, যাতে প্রকল্প এলাকায় দিনে অন্তত তিন বার করে পানি ছিটানো হয়। সেটি চলছে। এ ছাড়া শুষ্ক মৌসুমে ধুলাবালি এমনিতেই একটু বেশি ওড়ে। এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু দেখি না। কাজ করছে সিটি করপোরেশন।