নারীর ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে
দায়মুক্তির সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতেই হবে
দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা থামছেই না। আইনকে অমান্য করে নির্যাতনের ঘটনা-বৃদ্ধি সাধারণের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। একটা ভীতির আবহ তৈরি হয়েছে- যখন নির্যাতনের প্রতিকার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। সংবাদ মাধ্যমের তথ্য অনযায়ী ১৩ জুন শরীয়তপুর পৌরসভার উত্তর পালং এলাকায় এক নারীকে বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পৈশাচিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। খুঁটিতে বেঁধে রাখার আগে তার মাথার চুল কেটে মুখে কালি লাগিয়ে ও গলায় জুতার মালা পরিয়ে দেয়া হয়। এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়Ñ বরং এ ধরনের নির্যাতনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
দেশে ক্রমবর্ধমান নারী ও শিশু নির্যতনের প্রেক্ষাপটে ১৩ জুন রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আনোয়ারা বেগম-মুনিরা খান মিলনায়তনে ‘নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। সংলাপে নারী ও শিশু নির্যাতনের উদ্বেগজনক চিত্র, বিচারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, সামাজিক সংকট এবং প্রতিরোধের উপায় নিয়ে আলোচনা করেন সরকারের নীতিনির্ধারক, সাবেক বিচারপতি, শিক্ষাবিদ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধি, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও নারী অধিকারকর্মীরা।
ওই নাগরিক সংলাপে তথ্য দেয়া হয়- মাত্র পাঁচ মাসে সহিংসতার শিকার হয়েছে ১ হাজার ৩৫ জন নারী ও শিশু। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার ২৫০ জন, দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ৬৫ জন এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৮ জনকে। একই সময়ে বিভিন্ন কারণে হত্যা করা হয়েছে ২৩৭ জন নারী ও কন্যা শিশুকে এবং এই সময়ে আত্মহত্যা করেছেন ৬০ জন। এসব পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়, বরং দেশের নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা পরিস্থিতির এক ভয়াবহ বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
নারীর অগ্রগতি ও ক্ষমতায়নের নানা সাফল্যের গল্পের আড়ালে ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে সহিংসতার অন্ধকার। ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা, সাইবার বুলিং, প্রযুক্তিনির্ভর নিপীড়ন এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি নারী ও শিশুদের জীবনকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারহীনতা, সামাজিক বৈষম্য, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, মাদকাসক্তি এবং প্রযুক্তির অপব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন বলেন, দেশে নারী ও শিশু সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় আইন থাকলেও এর কার্যকর প্রয়োগ ও সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। মন্ত্রীর ভাষ্যমতে, নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং সচেতনতার অভাব সহিংসতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। নারী ও শিশুর অধিকার বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি কিশোর-কিশোরীদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আরও বেশি ক্লাব গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তবে মাননীয় মন্ত্রী সত্য কথাটিই বলেছেন যে, আইনের কার্যকর প্রয়োগ হচ্ছে না। আইনের প্রয়োগ ছাড়া মন্ত্রী আর যে পরামর্শ দিয়েছেন তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। অপরাধী আইন লঙ্ঘন করে রেহাই পেয়ে গেলে দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। এই পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ হতে পারে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষেই দায়মুক্তির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে।