রবিবার, নভেম্বর ০৮, ২০২৬

জ্বালানি হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে বায়োগ্যাস

প্রতিদিন উৎপাদন ৩২ হাজার ঘনফুট গ্যাস
নিজস্ব প্রতিবেদক ০৭ নভেম্বর ২০২৬ ১০:৪৪ অপরাহ্ন রাজশাহী অঞ্চল
নিজস্ব প্রতিবেদক ০৭ নভেম্বর ২০২৬ ১০:৪৪ অপরাহ্ন
জ্বালানি হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে বায়োগ্যাস

তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) মূল্যবৃদ্ধি এবং জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতির কারণে রান্নার বিকল্প হিসেবে বায়োগ্যাস জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। রাজশাহী নগরীর বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছে কমদামে রান্নার বিকল্প জ্বালানি হিসেবে বায়োগ্যাসের জনপ্রিয়তা বেড়েই চলেছে। বায়োগ্যাস শুধু রান্নার কাজেই ব্যবহৃত হয় না, এ থেকে নির্গত বর্জ্য পদার্থ জমিতে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বর্জ্য সার হিসেবে এবং পুকুরে মাছের খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।


গ্রামীণ প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষরা নাগরিক সুবিধার মতো তারা এখন রান্নার কাজেও গ্যাস ব্যবহার করতে পারছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে গবাদি পশু পালন করে গোবর ও অন্যান্য জৈব বর্জ্যকে রান্নার গ্যাসে রূপান্তর করতে পারেন। প্রক্রিয়ার শেষে অবশিষ্ট অংশ জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। যা কৃষকদের জন্য বাড়তি সুবিধা বয়ে আনে।


রাজশাহী যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৭টি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫০টি, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৫৮টি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১১৩টি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত আরও ১২টি প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে।


অধিদপ্তরের নথিপত্র অনুযায়ী, বর্তমানে মোট প্ল্যান্টের সংখ্যা ২৪০টি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এসব প্ল্যান্ট থেকে প্রতিদিন ৩২ হাজার ঘনফুটের বেশি গ্যাস এবং প্রায় ১ হাজার ৮২৪ কেজি জৈব সার উৎপাদিত হচ্ছে।


পবা উপজেলার নওহাটা পৌরসভার বাসিন্দা ও কৃষক জেসমিন খাতুন বলেন, বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপনের ফলে তাঁর রান্নার খরচ কমেছে এবং গবাদি পশুর বর্জ্যেরও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হয়েছে। তিনি বলেন, এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং বাড়িতে গবাদি পশুর গোবর সহজলভ্য আছে।  আমার স্বামী রান্নার ঝামেলা কমাতে একটি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট বসানোর পরামর্শ দেন। আমি রাজি হলে প্ল্যান্ট স্থাপন করেন।


জেসমিন গবাদি পশু ও ছাগল পালনের পাশাপাশি কোয়েল ও ব্রয়লার মুরগি পালন করেন, ভার্মিকম্পোস্ট (কেঁচো সার) তৈরি করেন এবং জৈব পদ্ধতিতে শাকসবজি চাষ করেন। বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপনের আগে রান্নার জন্য তাঁকে জ্বালানি কাঠের ওপর নির্ভর করতে হতো।


বর্তমানে তিনি গবাদি পশুর গোবরকে প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করছেন এবং প্ল্যান্ট থেকে বেরিয়ে আসা অবশিষ্ট অংশ (স্লারি) তাঁর ভার্মিকম্পোস্ট খামারে কাজে লাগাচ্ছেন। তবে তিনি জানান, প্রাথমিক স্থাপনা ব্যয় প্রতিবেশী পরিবারগুলোর জন্য একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে; তাদের অনেকের গবাদি পশু থাকলেও বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট বসানোর সামর্থ্য তাদের নেই।


তিনি বলেন, সরকার যদি তাদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করে, তবে অনেকেই বায়োগ্যাস প্রযুক্তি গ্রহণ করবেন। একটি প্ল্যান্ট দিয়ে এক বা দুটি পরিবারের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব।


বায়োগ্যাসের সম্ভাবনা কেবল গৃহস্থালির রান্নার কাজেই সীমাবদ্ধ নয়। পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি গবেষণায়—যা ২০২৬ সালে ‘এনার্জি রিপোর্টস’ (ঊহবৎমু জবঢ়ড়ৎঃং) সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়—রাজশাহী নগরীর জন্য বায়োগ্যাস, সৌরশক্তি ও বায়ুশক্তি ব্যবহার করে একটি নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক মাইক্রোগ্রিডের প্রস্তাব করা হয়েছে।


গবেষকরা একটি মডেল তৈরি করেছেন, যার মাধ্যমে ৫০০টি বৈদ্যুতিক তিন চাকার যানের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং ১০০টি হাইড্রোজেনচালিত যানবাহনের জন্য হাইড্রোজেন উৎপাদন করা সম্ভব। এতে বায়োগ্যাস তৈরির কাঁচামাল হিসেবে পৌর বর্জ্য ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। সিমুলেশন বা মডেলিং থেকে দেখা যায়, নগরীর সম্ভাব্য জ্বালানি চাহিদার পুরোটাই নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণ করা সম্ভব।


রাজশাহীর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শরিফুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন উপজেলায় বায়োগ্যাসের ব্যবহার বাড়ানোর লক্ষ্যে তাদের দপ্তর কাজ করে যাচ্ছে। এতে জ্বালানির খরচও কমবে আবার সারও পাওয়া যাবে। যা থেকে কৃষিতে উপকৃত হবে। 


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম হাবিবুর রহমান বলেন, বায়োগ্যাস একটি পরিবেশবান্ধব জ্বালানি বিকল্প, যা প্রচলিত জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে। সরকারের উচিত এই প্রযুক্তির দিকে আরও বেশি নজর দেওয়া এবং এর ব্যবহার সম্প্রসারণের উপায় খুঁজে বের করা।