রবিবার, নভেম্বর ০৮, ২০২৬

শব্দ দূষণের রাজশাহী মহানগরী

সোনার দেশ ০৭ নভেম্বর ২০২৬ ১০:৫৬ অপরাহ্ন সম্পাদকীয়
সোনার দেশ ০৭ নভেম্বর ২০২৬ ১০:৫৬ অপরাহ্ন
শব্দ দূষণের রাজশাহী মহানগরী

নিরসনে নেই কোনো পদক্ষেপ

রাজশাহী এখন শব্দ দূষণের নগরী। শান্তির নগরীখ্যাত রাজশাহী নগরী শব্দ দূষণের দৌরত্মে এখন অশান্তির নগরীতে পরিণত হয়েছে। নগরীতে চলাচলকারী সব যানবাহনই এখন উচ্চ শব্দ তুলে চলে। এ চালকের অভ্যাস। নগরীরর মোড়ে মোড়ে লক্ষ্য করা যাবে হর্ন বাজানোর প্রতিযোগিতা। নগরীতে কারণে-অকারণে হর্ন বাজানো হয়- মুহূর্ত সময় অপেক্ষা করার মানসিকতা নেই। 


শুধু কি যানবাহনের হর্ন- নগরীতে নির্মাণ কাজ, গ্রিল, টাইলস কাটা, মেশিনে ইট ভাঙা, মাইক বাজানো, জেনারেটরের শব্দে কান ঝালাপালা না হয়েই পারে না। এমনই ‘শব্দবাজি’ চলছে ভোর থেকে মধ্যরাত অবধি। হর্ন বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এলাকাতেই শব্দ-সমারোহ থেমে নেই। শব্দদূষণ প্রতিরোধে আইন আছে কিন্তু এর প্রয়োগ নেই। জচালকদের কাছে শব্দ করাই স্বাভাবিকঘটনা।


সোনার দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০২২ সাল থেকে রাজশাহী নগরের শব্দের মাত্রা পরিমাপ করছে বরেন্দ্র পরিবেশ উন্নয়ন নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। সংগঠনটির পরিমাপ করা তথ্য বলছে, নগরের বিভিন্ন এলাকায় শব্দের মাত্রা নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি। শহরের শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান চত্বর (রেলগেট) এর একটি উদাহরণ। ২০২২ সালে সেখানে শব্দের মাত্রা ছিল ৯০ ডেসিবেল। চলতি বছরের মে মাসে একই স্থানে পরিমাপ করে পাওয়া গেছে ৯৭ দশমিক ২ ডেসিবেল। অর্থাৎ চার বছরে শব্দের মাত্রা বেড়েছে ৭ দশমিক ২ ডেসিবেল। এই শব্দ দূষণ থেমে থেমে নয়, ধারাবাহিকভাবেই চলতে থাকে।


পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ক্ষমতাবলে ২৪ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২৫ জারি করেছে সরকার। এতে পুলিশকে ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে॥ প্রথমবারের মতো ট্রাফিক সার্জেন্ট বা তার ওপরের পদের পুলিশ কর্মকর্তারা অপরাধী বা নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের ঘটনাস্থলেই সরাসরি জরিমানা করতে পারবেন, যা আগে শুধু এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে হতো।


কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো পাবলিক প্লেস বা জনপরিসরে লাউডস্পিকার, মাইক, অ্যাপ্লিফায়ার ও সুরযন্ত্র ব্যবহার করা নিষিদ্ধ। অনুমতিক্রমে ব্যবহার করলেও শব্দের মাত্রা ৯০ ডেসিবেলের বেশি হতে পারবে না এবং তা রাত ৯টার (অথবা কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে রাত ১১টার পূর্বে) মধ্যে শেষ করতে হবে। নীরব বা শব্দহীন এলাকায় হর্ন বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ ছাড়া এসব এলাকায় আতশবাজি, পটকা ফুটানো ও উচ্চ শব্দ সৃষ্টিকারী কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু কোথাও কোনো পরিসরে শব্দ দূষণ থেমে নেই। 


অথচ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শব্দ দূষণ মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক ও সুদূর প্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত মাত্রায় বা উচ্চ শব্দের মধ্যে থাকলে কানের ভেতরের সংবেদনশীল স্নায়ু ও কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা সাময়িক বা স্থায়ীভাবে শ্রবণশক্তি কমিয়ে দিতে পারে। কানের ভেতর অনবরত ভোঁ ভোঁ, সিঁধেল বা শিরশির শব্দ হওয়া বা বাঁশি বাজার মতো অনুভূতি তৈরি হতে পারে। এছাড়াও অতিরিক্ত শব্দ শরীরের সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেমকে সক্রিয় করে তোলে, ফলে রক্তচাপ বৃদ্ধি পায়। দীর্ঘস্থায়ী শব্দ দূষণ হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয় এবং করোনারি হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক এমনকি স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।


এ ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তর, মেট্রোপলিটান পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের সমন্বিত উদ্যোগ থাকা প্রয়োজন। জনসচেতনতা যেমন দরকার তেমনি গাড়ি চালকদের সাথে পরিস্থিতি উন্নয়নে কম্যসূচির প্রয়োজন। সেই সাথে আইনের প্রয়োগ চলমান রাখতে হবে।