শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী নির্যাতন
আইনের প্রয়োগ ও নিয়মিত নজরদারি চাই
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ। তারপরও নির্যাতন থামছে না। শুধু মাদ্রাসায় নয়, বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের শিক্ষার্থীরাও শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে অহরহ। অথচ বিষয়টি গুরুত্বহীন বিবেচিত হচ্ছে।
সোনার দেশ পত্রিকার এক প্রতিবেদনের তথ্যমতে, পাবনায় একটি মাদরাসার শিশু শিক্ষার্থীকে নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। চুরির অপবাদ দিয়ে এক শিক্ষার্থীকে নির্মমভাবে বেত্রাঘাত ও লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করেছেন এক শিক্ষক। ২০ জুলাই এই ঘটনা সংঘটিত হয়। এটা শাসন না পৈশাচিকতা? অভিযুক্ত শিক্ষককে ৫৪ ধারায় আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
২০১১ সালে হাইকোর্ট শিশুদের শারীরিক শাস্তি দেয়ার বিষয়টি বেআইনি এবং অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছেন। আর হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি দেয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে একটি পরিপত্র জারি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু তারপরও প্রায়ই ঘটছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনা। তবে, অভিভাবক ও শিশু অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা পরিপত্রের প্রয়োগ কমই হচ্ছে। নির্যাতনের ঘটনায় নজরদারিও কম। এ কারণে শিশু নির্যাতন বাড়ছে। অনেকে আবার বিষয়টি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে এড়িয়ে যান। ফলে এমন নির্যাতনের জাঁতাকল থেকে শিশুদের রেহাই মিলছে না।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী নির্যাতন বাড়ার পেছনে মূলত শিক্ষকদের সেকেলে মানসিকতা, আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং সামগ্রিক সামাজিক অস্থিরতাও শিশু নির্যাতনে সহায়ক হচ্ছে। এখনো অনেক শিক্ষক এবং অভিভাবক বিশ্বাস করেন যে, শিক্ষার্থীদের ভালোর জন্য তাদেরকে কড়া শাসনে রাখতে হবে, প্রয়োজনে শারীরিক নির্যাতন করতে হবে। এই সেকেলে ধারণা নির্যাতনকে উৎসাহিত করছে। কখনই শিশুদের মনস্তাত্বিক সম্পর্ক তৈরির প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দেয়া হয় না। খুব সরলভাবে এই ধারণাও প্রোথিত করা যায় নি যে, শিশুরা যা করে ভুল ক’রে করে-সেটা কোনোভাবেই অপরাধ হিসেবে গন্য করা যায় না।
প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে অবশ্যই না। শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন ঘরে-বাইরে কিংবা শিক্ষা পড্রতিষ্ঠানে হোক না কেন তা শিশুর মনোজগতে স্থায়ীভাবে ছাপ পড়ে- যা তার সুস্থভাবে বেড়ে ওঠাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। নির্যাতনের সংস্কৃতি সমাজে স্বীকৃত হলে শিশুর সুস্থ মানসিকতা গড়ে তোলা যায় না। শিক্ষার আধুনিক ধারণা- যা শিশুকে সু নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক হবে- এর কোনো বিকল্প নেই। স্কুল শিক্ষার স্থান, একই সাথে স্কুল বন্ধুত্বের জায়গা, আনন্দের জায়গা। যেখান থেকে শিক্ষার্থী বিশ্ব মানবে পরিণত হয়ে থাকে। নির্যাতন দিয়ে আর যাই হোক মানবিক ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়া যায় না। সরকারের উচিৎ হবে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, নিয়মিত নজরদারি এবং দেশের মানুষকে সচেতন ও সক্ষম করে গড়ে তোলার পদক্ষেপ নেয়া।