কচুরিপানার দখলে চলনবিল অঞ্চলের বিস্তীর্র্ণ জলাভূমি
নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলাজুড়ে বিস্তৃত বৃহৎ চলনবিলের বিস্তীর্ণ জলাভূমি এখন কচুরিপানার নিচে আবদ্ধ। ফলে বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, কৃষক ও পর্যটকরা। চলনবিলাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র নাটোরের গুরুদাসপুর ও সিংড়াসহ সিরাজগঞ্জের তাড়াশের বিলাঞ্চলে হাজার হাজার হেক্টর জমি এখন কচুরিপানার দখলে। এতে নৌ চলাচল ও জলপথের বানিজ্য প্রায় বন্ধের উপক্রম হয়েছে।
এদিকে ভরা বর্ষায় কচুরিপানার আগ্রাসনে চলনবিলের সুস্বাদু মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে মাছ সংকটসহ কৃষকের জমির আমন ধান, আগাম সরিষা, গম ও ইরি-বোরো চাষাবাদ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। বিলের প্রধান নৌ পথগুলোতে কচুরিপানার জটে স্বাভাবিক নৌ যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন দিনমজুর ও নৌকার মাঝিরা।
সরেজমিন দেখা গেছে, চলনবিলের প্রাণকেন্দ্র গুরুদাসপুরের খুবজীপুর ইউনিয়নের বিলশা ‘মা জননী সেত’ু এলাকা, বামনবাড়িয়া, পিপলা, শ্রীপুর, বিলহরিবাড়ি, যোগেন্দ্রনগর, মশিন্দা, বিশ্বরোডের ১০নং ব্রীজ এলাকা, সিংড়া উপজেলার ডাহিয়া, ইতালী, চৌগ্রাম, কলম, তাজপুর ও শেরকোল ইউনিয়নসহ অন্তত ৩০টি গ্রামের বিলে কচুরিপানার আগ্রাসন চলছে। পার্শ্ববর্র্তী তাড়াশ, ভাঙ্গুড়া, হান্ডিয়াল উপজেলার বিভিন্ন বিলেরও একই অবস্থা। বিগত বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পর এবার কচুরিপানার আগ্রাসনে নতুন করে বিলপাড়ের প্রায় ৩০ হাজার কৃষক দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বিলসা বিলের প্রায় ৭০০ হেক্টর জমি এখন কচুরিপানার নিচে। বিলে দেখা মিলছে না দেশীয় মাছের।
বিলশা গ্রামের কৃষক ফারুক হোসেন, বামনবাড়িয়ার গোলাপ মন্ডল, পিপলার ময়েজ উদ্দিন, হরদমার হাসান আলীসহ অনেকে বলেন, ‘কচুরিপানা পরিষ্কার করতে পকেটের টাকা শেষ হয়ে যাচ্ছে। এক বিঘা জমির কচুরিপানা পরিষ্কার করতে ১০-১২ জন শ্রমিক প্রয়োজন হচ্ছে। চুক্তিতে ছাড়াও শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি দিতে হচ্ছে ৭শো থেকে ১ হাজার টাকা। জমিতে কচুরিপানার ছাড়াও আড়াইল ঘাসের পরিমাণ বাড়ছে।’
পার্শ্ববর্তী সিংড়ার ডাহিয়া গ্রামের রুবেল আলী ও কাউয়াটিকরির বাবলু সরকার জানান, শুধু কচুরিপানা পরিষ্কার করতেই প্রতি বিঘা জমিতে অতিরিক্ত ৫-৭ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। সরকারি সহযোগিতা নেই। অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে জমি পরিষ্কারের চেষ্টা করলেও শ্রমিক সংকটের কারণে কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
চলনবিল রক্ষা আন্দোলন কমিটির গুরুদাসপুর শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আক্কাছ বলেন, ‘চলনবিল দেশের অন্যতম খাদ্যশস্য ভাণ্ডার। বিলের জমিতে চাষাবাদ ব্যাহত হলে খাদ্য সরবরাহে চাপ পড়বে। কচুরিপানার কারণে জলজ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে।’
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলাম দোলন বলেন, সিংড়া থেকে চাটমোহর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা এখন কচুরিপানার নিচে। সরকারি উদ্যোগে দ্রুত কচুরিপানা অপসারণ না হলে বিলের কৃষি অর্থনীতি ভেঙে পড়বে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কেএম রাফিউল ইসলাম ও সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা রতন কুমার সাহা বলেন, ‘বিলসা বিলে কচুরিপানার নিচে প্রায় ৭শো হেক্টর কৃষিজমি। বিভিন্ন স্থানে মা ও পোনা মাছ নিধনকারী অবৈধ সোঁতিজালের কারণে কচুরিপানা আটকে জট সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে আবদ্ধ বিলে মাছের প্রজনন কমছে। কচুরিপানা ও সোঁতিজাল অপসারণ কার্যক্রম চলমান আছে। এছাড়া কৃষকদের পরামর্শের পাশাপাশি মেশিন দিয়ে কচুরিপানা কেটে পরিস্কারে সহযোগিতা করা হচ্ছে।’
গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ বলেন, বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে কৃষি বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে আছে উপজেলা প্রশাসন।